Category: সম্পাদকীয়

  • দিনের ভোট দিনে ঝুঁকি নয়, খুঁজুন আস্থার পথ–আহমেদ আবু জাফর

    দিনের ভোট দিনে ঝুঁকি নয়, খুঁজুন আস্থার পথ–আহমেদ আবু জাফর

    দিনের ভোট দিনে ঝুঁকি নয়, খুঁজুন আস্থার পথ-আহমেদ আবু জাফর, সভাপতি, নির্বাহী কমিটি ও চেয়ারম্যান, ট্রাস্টি বোর্ড, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম।

    জাতীয় নির্বাচন একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক শক্তি ও পরিপক্বতার প্রতিফলন। এই গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ যত স্বচ্ছ ও প্রশ্নমুক্ত হবে, ততই জনগণের আস্থা দৃঢ় হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো ভোটের আগের রাতে ব্যালট পেপার ও ব্যালট বাক্স ভোটকেন্দ্রে পাঠানোর প্রচলন দীর্ঘদিন ধরেই নির্বাচন ব্যবস্থাকে বিতর্কিত ও অবিশ্বাসের মুখে ফেলেছে।
    এই প্রেক্ষাপটে “দিনের ভোট রাতে নয়” বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান আহমেদ আবু জাফরের আহ্বানটি বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। আমরা দেখেছি ইতিপূর্বে ভোটের আগের রাতে ভোট কেন্দ্র গুলো চরম ঝুকিপূর্ণাবস্থা। যেখানে প্রিজাইডিং-পুলিং অফিসার থেকে শুরু করে প্রশাসনের লোকজন কেন্দ্রের ব্যালট-বাক্স পাহারা দিতে গিয়ে চরম খারাপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। গোলাগুলি, হতাহত, ব্যালট বাক্স ছিনতাই কিংবা অধিকাংশ ব্যালটে রাতেই সিল মারার মত চরম নষ্ট কাজ সম্পন্ন করতে হয়েছে। ফলে ভোটাররা কেন্দ্রে গিয়ে তাদের ভোট খুঁজে পায়নি, এমনকি মৃত্যু ব্যক্তির ভোটও সেরে ফেলেছিলো।

    কেনো দেশের জনগনের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে পারা ঐ রাষ্ট্রের পরবর্তী মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হওয়ার প্রথম সফল উদাহরণ। তবে ভোটাধিকার প্রশ্নে বাংলাদেশে তা দীর্ঘদিন ধরে নানা কারণে অনুপস্থিত।

    অনেকেই যুক্তি দেন, ভোটের দিন সকালে ব্যালট পাঠালে ভোটের আগের রাত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ব্যালট পেপার ও বাক্স যদি ভোটের আগের রাতে ভোটকেন্দ্রে না রেখে নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রিত হেফাজতেই থাকে, তবে সেই রাত আর ঝুঁকিপূর্ণ থাকে না, বরং ঝুঁকিমুক্ত হয়। এতে অনিয়মের আশঙ্কা, গুজবের সুযোগ এবং অস্বচ্ছতার অভিযোগ অনেকাংশে কমে যায়।

    ভোটের দিন সকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তত্ত্বাবধানে ব্যালট সামগ্রী কেন্দ্রে পৌঁছানো হলে দায়িত্বের সীমারেখা স্পষ্ট হয়। নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সব পক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত হয়। একই সঙ্গে ভোটারদের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মায় যে ভোট শুরুর আগেই তাদের ভোট নিয়ে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার সুযোগ নেই।

    আমরা আশা করছি দীর্ঘদিনের এই পুরানো রুট পরিবর্তন করে নতুন রুটে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে বাংলাদেশে দিনের ভোট রাতের প্রথাটি বিলুপ্ত হতে বাধ্য। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কেবল ভোট গ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; ভোটের আগের প্রস্তুতিই নির্ধারণ করে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা। প্রশ্নবিদ্ধ প্রস্তুতি শেষ পর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ ফলাফলই জন্ম দেয়, যার খেসারত দিতে হয় জনগন, রাষ্ট্র ও গণতন্ত্রকে।

    অতএব দিনের ভোট দিনের আলোতেই হওয়া উচিত। ভোটের দিন সকালে ব্যালট পেপার ও বাক্স কেন্দ্রে পাঠানো কোনো ঝুঁকির সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি নির্বাচনকে ঝুঁকিমুক্ত, স্বচ্ছ ও জনআস্থাভিত্তিক করার একটি কার্যকর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। নির্বাচন কমিশনের উচিত এই বাস্তবতা অনুধাবন করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া, যা প্রশ্ন নয়, আস্থা তৈরি করে।

  • প্রেস টেবিল: দল নিরপেক্ষ সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্ন

    প্রেস টেবিল: দল নিরপেক্ষ সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্ন

    প্রেস টেবিল: দল নিরপেক্ষ সাংবাদিকদের
    নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্ন

    রাজনৈতিক দলগুলোর সভা-সমাবেশ, আলোচনা অনুষ্ঠান, সংবাদ সম্মেলন কিংবা বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক আয়োজনে সংবাদ কাভারেজের জন্য আমন্ত্রিত সাংবাদিকদের জন্য একটি নির্দিষ্ট স্থান বরাদ্দের রীতি একসময় প্রচলিত ছিল। এই আলাদা টেবিল বা নির্ধারিত জায়গাটিই পরিচিত ছিল ‘প্রেস টেবিল’ নামে। এটি কেবল বসার স্থান নয়, বরং সাংবাদিকদের পেশাগত পরিচয় ও নিরাপত্তার একটি স্বীকৃত কাঠামো ছিল। তা এখন সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাটি অনেকটাই হারিয়ে গেছে। আজকের বাস্তবতায় প্রেস টেবিলের অনুপস্থিতি সাংবাদিকতার জন্য একটি নীরব সংকটে পরিণত হয়েছে। অথচ এই প্রেস টেবিল কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি দল নিরপেক্ষ সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, পেশাগত মর্যাদা, স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার প্রতীক।

    বর্তমানে অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের আয়োজনে সাংবাদিকদের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা না থাকায় সংবাদকর্মীরা বাধ্য হচ্ছেন রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ভিড়ে, কখনো মঞ্চের একেবারে পাশে, কখনো বা কর্মীদের ঘাড়ে ঘাড় মিলিয়ে দাঁড়িয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে। এমন পরিস্থিতিতে একজন পেশাদার সাংবাদিকের নিরপেক্ষতা যেমন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তেমনি তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তাও পড়ে চরম ঝুঁকিতে। একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকের জন্য এ ধরনের পরিবেশ শুধু বিব্রতকরই নয়, অনেক ক্ষেত্রে তা অবমাননাকর এবং অসহনীয়ও বটে।

    ঝুঁকির মুখে সাংবাদিকতা: ইতিপূর্বে বহু রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতে সংবাদ কাভারেজ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা বিদ্বেষমূলক আচরণ, হেনস্তা এমনকি শারীরিক আক্রমণের শিকার হয়েছেন, এমন নজির নতুন নয়। দলীয় কর্মীদের সঙ্গে একই সারিতে অবস্থানের কারণে অনেক সময় সাংবাদিকদের ছবি ও ভিডিও এমনভাবে ধারণ করা হয়েছে, যা পরবর্তীতে তাদের পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনের জন্য ‘কাল’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

    সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একটি স্থিরচিত্র বা কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও একজন সাংবাদিককে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত করতে যথেষ্ট। বাস্তবে নিরপেক্ষ থাকলেও এসব বিভ্রান্তিকর উপস্থাপনার দায় শেষ পর্যন্ত সাংবাদিককেই বহন করতে হয়।

    বিশেষ করে গত ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে আমরা দেখেছি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী না হয়েও শুধুমাত্র কোনো একটি ফ্রেমে বা ভিডিওতে উপস্থিত থাকার কারণে বহু সাংবাদিক হামলা, মামলা, জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে পড়া একজন সাংবাদিকের জন্য চরম দুর্ভাগ্যজনক এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্যও অশনিসংকেত।

    প্রেস টেবিল থাকলে এ বিপর্যয় এড়ানো যেত:রাজনৈতিক দলগুলোর আয়োজনে যদি গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট ‘প্রেস টেবিল’ বা আলাদা মিডিয়া জোন রাখা হতো, তবে সাংবাদিকদের এমন করুণ পরিণতির মুখোমুখি হতে হতো না। এতে একদিকে যেমন সংবাদ সংগ্রহ হতো সহজ, সুশৃঙ্খল ও পেশাদার পরিবেশে, অন্যদিকে সাংবাদিকদের দলীয় পরিচয়ের অপবাদ থেকেও মুক্ত রাখা যেত।

    প্রেস টেবিল সাংবাদিক ও রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটি স্বাস্থ্যকর পেশাদার দূরত্ব তৈরি করে, যা একটি গণতান্ত্রিক সমাজে অত্যন্ত জরুরি। এই দূরত্ব সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করার সাহস জোগায় এবং রাজনৈতিক দলগুলোকেও গণমাধ্যমের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে বাধ্য করে। একই সঙ্গে এটি ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ঝুঁকিও অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।

    দল নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা এখনো বেঁচে আছে:এখনো দেশে বহু দল নিরপেক্ষ সাংবাদিক রয়েছেন, যারা কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন বা সহযোগী শক্তি না হয়েও সততা, নৈতিকতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তাদের কাছে রাজনৈতিক দলের আয়োজনে এই অব্যবস্থাপনা, অবহেলা ও অসচেতনতা চরম হতাশাজনক এবং অসহনীয়।

    রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আমাদের বিনীত অনুরোধ; গণমাধ্যমকে প্রতিপক্ষ কিংবা সুবিধাভোগী হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করুন। সাংবাদিকরা কোনো দলের মুখপাত্র নন, আবার শত্রুও নন। তারা সমাজের দর্পণ—যেখানে ভালো-মন্দ উভয় চিত্রই প্রতিফলিত হয়।

    রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বের দৃষ্টি আকর্ষণ: আমরা আশা করবো, রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এ বিষয়টি আন্তরিকভাবে বিবেচনা করবেন এবং ভবিষ্যতে সকল রাজনৈতিক আয়োজনে গণমাধ্যমের জন্য আলাদা প্রেস টেবিল বা নির্ধারিত স্থান নিশ্চিত করবেন। এটি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি একটি সুস্থ, সহনশীল ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতেও সহায়ক হবে।

    সবশেষ কথা, প্রেস টেবিল কোনো বিলাসিতা নয়—এটি সাংবাদিকতার ন্যূনতম অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করা মানেই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা।

    লেখক: আহমেদ আবু জাফর সভাপতি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি ও চেয়ারম্যান, ট্রাস্টি বোর্ড, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম , ০১৭১২৩০৬৫০১ , জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিঃ

  • পোশাকশিল্পে ধারাবাহিক অগ্নিকাণ্ড: নাশকতার গন্ধে শঙ্কিত দেশ

    পোশাকশিল্পে ধারাবাহিক অগ্নিকাণ্ড: নাশকতার গন্ধে শঙ্কিত দেশ

    দেশের তৈরি পোশাকশিল্পকে অস্থিতিশীল করতে পরিকল্পিত নাশকতার আশঙ্কা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। সর্বত্র একটিই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে কি এবার টার্গেট করা হয়েছে দেশের রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পকে? গত এক সপ্তাহে একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ধরন ও প্রেক্ষাপট সেই সন্দেহকে আরও দৃঢ় করেছে। শিল্পমালিকদের ধারণা, দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে গার্মেন্টস শিল্পে আগুন লাগানো হচ্ছে—যা এই খাতকে ধ্বংসের জন্য ভয়াবহ অপচেষ্টা হতে পারে। ফলে শিল্পাঞ্চলগুলোতে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানোর দাবি উঠেছে সব মহল থেকেই।

    পুলিশের উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে, সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থা ছাড়াও বিভিন্ন ইউনিট সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থাও নিজ নিজ অবস্থান থেকে সরকারকে সঠিক তথ্য দিতে তৎপরতা জোরদার করেছে।

    একাধিক সূত্রের তথ্যমতে, গণ-অভ্যুত্থানবিরোধী শক্তিগুলো সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে নানাভাবে সক্রিয় রয়েছে। গত বছর ৫ আগস্টের পর থেকে তারা বিভিন্ন পন্থায় একের পর এক আঘাতের অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে। সেই সময় সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুর এলাকায় গুজব ছড়িয়ে বহু কারখানা ভাঙচুর করা হয়, যা পুলিশ ও সেনাবাহিনীর যৌথ প্রচেষ্টায় প্রতিহত হয়। তবে দেশবিরোধী চক্রটি আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে তিনটি অগ্নিকাণ্ড—যেগুলো সবই গার্মেন্টস ও শিল্পসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় ঘটেছে—সেই আশঙ্কাকে আরও জোরালো করেছে। বিদেশে বসে সরকারবিরোধী হুমকি দেওয়া কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর সঙ্গে এসব ঘটনার যোগসূত্র থাকার যুক্তিও খণ্ডন করা যাচ্ছে না।

    গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এ কারণে অগ্নিকাণ্ডের শিকার প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের রাজনৈতিক পরিচয় ও নানামুখী সংযোগ খতিয়ে দেখা শুরু করেছে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশবিরোধী কিছু মহল দীর্ঘদিন ধরেই দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের ভাবমূর্তি নষ্টে তৎপর। শ্রমিক নিরাপত্তা, মজুরি, কর্মপরিবেশ ও ট্রেড ইউনিয়ন ইস্যুতে নেতিবাচক প্রচার চালানো হচ্ছে, যার ধারাবাহিকতা হতে পারে সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডগুলোও।

    এমনকি গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, কিছু গার্মেন্ট মালিকও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন—যারা অতীতে বিভিন্নভাবে রাজনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন। তাদের কেউ কেউ শ্রমিক আন্দোলন উসকে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলেও জানা যায়।

    ঘটনাগুলোর ভয়াবহতা বিবেচনায় এখন প্রশ্ন উঠছে—এসব নিছক দুর্ঘটনা, নাকি পরিকল্পিত নাশকতা? ১৪ অক্টোবর মিরপুরের শিয়ালবাড়ির আগুনে ১৬ শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু, ১৬ অক্টোবর চট্টগ্রাম ইপিজেডে পোশাক কারখানায় আগুন, এবং সর্বশেষ শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড—সবগুলোই সন্দেহজনক প্রেক্ষাপটে ঘটেছে।

    বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম কার্গো ভিলেজের অগ্নিকাণ্ডকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, এমন সংবেদনশীল স্থানে আগুন লাগা নিরাপত্তার বড় প্রশ্ন তোলে। তিনি সরকারের দ্রুত তদন্ত দাবি করে বলেন, সাম্প্রতিক ধারাবাহিক অগ্নিকাণ্ড উদ্যোক্তাদের মনে ভয় সৃষ্টি করেছে, যা বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।

    বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল আরও স্পষ্ট করে বলেন, “বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পকে ধ্বংসে পরিকল্পিতভাবে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলো ঘটানো হচ্ছে।” তাঁর মতে, বিমানবন্দরের মতো উচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় আগুন লাগা নিছক কাকতালীয় হতে পারে না। তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রমে গতি আনার আহ্বান জানিয়েছেন এবং শিল্পাঞ্চলে দ্রুত নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা জোরদারের পরামর্শ দিয়েছেন।

    বিজিএমইএ’র সিনিয়র সহ-সভাপতি ইনামুল হক খানও দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, ক্ষতিগ্রস্তদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন না হলে এই খাতের প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধার কঠিন হবে।

    বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প শুধু অর্থনীতির মেরুদণ্ড নয়, লাখো মানুষের জীবিকার উৎস। তাই এই শিল্পকে লক্ষ্য করে যেকোনো নাশকতা বা ষড়যন্ত্র জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে সরাসরি আঘাত। সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপই পারে এই চক্রকে চিহ্নিত ও দমন করতে। নইলে দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত এবং এর সঙ্গে জড়িত কোটি মানুষের জীবিকা গভীর সংকটে পড়বে—যার দায়ভার গোটা জাতিকেই বহন করতে হবে।

  • অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে প্রতিক্রিয়ার নয়, প্রয়োজন স্থায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা

    অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে প্রতিক্রিয়ার নয়, প্রয়োজন স্থায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা

    দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আবারও অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ জনস্বাস্থ্যে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। রংপুর বিভাগে এখন পর্যন্ত শনাক্ত হয়েছে ২৭ জন রোগী, আর মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় চলতি বছরের নয় মাসেই আক্রান্তের সংখ্যা ৪৭৫। যদিও সাম্প্রতিক সপ্তাহে নতুন সংক্রমণের খবর কমেছে, তবু আতঙ্ক এখনো রয়ে গেছে গ্রামাঞ্চলে। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের ঘটনা যেন এক শিক্ষণীয় উদাহরণ। একটি অসুস্থ গরু জবাই করে মাংস ভাগাভাগি করার পর ১১ জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ দেখা দেয়। এই এক ঘটনাই প্রমাণ করে যে সচেতনতার ঘাটতিই সংক্রমণ বিস্তারের প্রধান কারণ।

    অ্যানথ্রাক্স কোনো নতুন রোগ নয়—এটি ব্যাসিলাস অ্যানথ্রাসিস নামক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ, যা মূলত আক্রান্ত পশুর রক্ত, মাংস বা চামড়ার সংস্পর্শে এলে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। অথচ অনেক এলাকাতেই আজও সংক্রমিত পশু জবাই ও বিক্রির প্রচলন চলছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।

    স্বাস্থ্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগ সংক্রমণ ঠেকাতে সতর্ক অবস্থান নেওয়ার কথা জানিয়েছে। আইইডিসিআর মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, নমুনা সংগ্রহ ও সচেতনতামূলক প্রচারও চলছে। কিন্তু মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা ও রংপুরের অভিজ্ঞতা বলছে, এসব পদক্ষেপ এখনো যথেষ্ট নয়। গবাদি পশুর টিকাদান কাভারেজ সীমিত, প্রাণিসম্পদ বিভাগে জনবল ঘাটতি রয়েছে, এবং গ্রামীণ পর্যায়ে নিরাপদ মাংস ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সচেতনতা অত্যন্ত কম।

    অ্যানথ্রাক্সে মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে কম হলেও এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা রাখে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ব্যর্থ হলে তা বড় আকার ধারণ করতে পারে। তাই প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে প্রতিরোধই হতে হবে মূল কৌশল। আক্রান্ত এলাকায় অবিলম্বে গবাদি পশুর শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করা, সন্দেহজনক পশু জবাই নিষিদ্ধ করা এবং স্থানীয় মাংস বিক্রেতাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি। একইসঙ্গে তথ্যপ্রবাহ ও গণসচেতনতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

    সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্য যেমন আতঙ্ক বাড়ায়, তেমনি সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগের দ্রুত ও স্বচ্ছ তথ্যদানের অভাবও ভীতি ছড়ায়। এ কারণেই সুন্দরগঞ্জে এক নারীর মৃত্যুকে ঘিরে গুজব ছড়িয়েছিল। ভবিষ্যতে এ ধরনের বিভ্রান্তি এড়াতে স্থানীয় প্রশাসন ও গণমাধ্যমের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

    অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধ শুধু চিকিৎসা বা পশুচিকিৎসার বিষয় নয়—এটি একযোগে স্বাস্থ্য, কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও তথ্যপ্রবাহ ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ। তাই এখন সময় হলো এই রোগটিকে মৌসুমি সমস্যা হিসেবে নয়, বরং গ্রামীণ জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার স্থায়ী অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করার। জনসচেতনতা ও ভ্যাকসিনেশন—এই দুই অস্ত্রই হতে পারে অ্যানথ্রাক্স নিয়ন্ত্রণের কার্যকর উপায়।

  • জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নসহ ৫ দফা দাবিতে পিরোজপুর জেলা জামায়াতের স্মারক লিপি প্রদান

    জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নসহ ৫ দফা দাবিতে পিরোজপুর জেলা জামায়াতের স্মারক লিপি প্রদান

    সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী ফেব্রুয়ারী ‘২৬ এ অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি, গণভোট আয়োজনসহ কেন্দ্রঘোষিত কর্মসূচীর অংশ হিসেবে ৫ দফা দাবিতে পিরোজপুর জেলা জামায়াতের পক্ষ থেকে মিছিল সহকারে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা বরাবর পিরোজপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশরাফুল আলম খানের কাছে স্মারক লিপি হস্তান্তর করেন।

    স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয় ইতোমধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ নির্ধারন করা হয়েছে। রোডম্যাপ অনুযায়ী অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও ভয়ভীতিমূক্ত গ্রহনযোগ্য নির্বাচন নতুন বাংলাদেশের অন্যতম দাবী। নির্বাচনে কালো টাকার ব্যবহার বন্ধ, ভোট কেন্দ্র দখল, পেশি শক্তি প্রদর্শন ও ভোটকেন্দ্রে নানাবিধ অনিয়ম ও অপতৎপরতা বন্ধ এবং দক্ষ সংসদ সদস্য নির্বাচিত করার লক্ষ্যে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন বর্তমানে গণ দাবীতে পরিনত হয়েছে। বিগত সরকার বিভিন্ন স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদি পদক্ষেপের মাধ্যমে সংবিধান, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসহ রাষ্ট্রীয় সকল প্রতিষ্ঠানকে রাজনীতিকরণ করে ধ্বংস করেছে। বিরোধী মতে মানুষের উপর জুলুম-নির্যাতন, মিথ্যা মামলা, হামলা, গ্রেফতার, জেল-জরিমানা, গুম, খুন করে দেশপ্রেমিক মানুষ ও মূক্ত গণমাধ্যমের কন্ঠকে স্তম্ভিত করেছে। দিনের ভোট রাতে নির্বাচনের নামে জাতির সাথে প্রহসন করেছে। বিশ্ববাসীর কাছে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে।

    অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণ মূলক নির্বাচনের স্বার্থে ফ্যাসিস্টের দোসর জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ সহ নিম্নোক্ত ৫দফা দাবি পেশ করেন-
    ১. আগামী ফেব্রুয়রীতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি ও উক্ত আদেশের উপর গণভোট আয়োজন করা
    ২. আগামী জাতীয় নির্বাচনে উভয় কক্ষে পিআর পদ্ধতি চালু করা।
    ৩. অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহনযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে সকলের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা।
    ৪. ফ্যাসিস্ট সরকারের সকল জুলুম-নির্যাতন, গণহত্যা ও দুর্নীতির বিচার দৃশ্যমান করা।
    ৫. স্বৈরাচারের দোসর জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে হবে।

    স্মারকলিপি প্রদানের আগে জেলাপ্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জেলা জামায়াতের আমীর তোফাজ্জল হোসাইন ফরিদ, পিরোজপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী জননেতা শামীম সাঈদী, জেলা সেক্রেটারী মো. জহিরুল হক, জেলা সহকারী সেক্রটারী শেখ আব্দুর রাজ্জাক, পেশাজীবি সংগঠনের সেক্রেটারী ড. আব্দুল্লাহিল মাহমুদ, শিবিরের জেলা সভাপতি মো. এমরান হোসেন প্রমুখ।

    এ সময় জেলা নায়েবে আমীর আব্দুর রব সহ জেলা ও উপজেলা নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

    সমাবেশ শেষে জেলা নেতৃবৃন্দ পিরোজপুরের জেলা প্রশাসকের নিকট স্মারকলিপি হস্তান্তর করেন।