Category: সম্পাদকীয়

  • বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় ছাদে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ: হতে পারে একটি সমন্বিত উদ্যোগ–আহমেদ আবু জাফর

    বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় ছাদে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ: হতে পারে একটি সমন্বিত উদ্যোগ–আহমেদ আবু জাফর

    দেশজুড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিয়ম, লোডশেডিং ও ক্রমবর্ধমান চাহিদা জনজীবন ও অর্থনীতিতে যে চাপ তৈরি করছে, তা কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ছাড়া মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুতের ওপর চাপ কমানো এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থাকে দ্রুত সম্প্রসারণ করা এখন সময়ের দাবি। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সৌরবিদ্যুৎ হতে পারে একটি কার্যকর ও টেকসই সমাধানের অন্যতম পথ। আমাদের দেশে বছরের বড় একটি সময় পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাওয়া যায়। অথচ সরকারি-বেসরকারি ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, রেলওয়ে স্টেশনসহ অসংখ্য স্থাপনার ছাদ ও খোলা জায়গা এখনো সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়নি।সরকার চাইলে একটি সময়বদ্ধ জাতীয় কর্মসূচির মাধ্যমে এই বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে।

    প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে আগামী তিন মাসের মধ্যে দেশের সব সরকারি অফিস-আদালত ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনায় পর্যায়ক্রমে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বড় বাণিজ্যিক ভবনগুলোকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হলে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান ঘটতে পারে। এ ক্ষেত্রে শুধু নতুন সোলার প্যানেল স্থাপন করাই নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা, গ্রিড-সংযুক্ত (on-grid) সৌরবিদ্যুৎ এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের দক্ষ ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। এর ফলে দিনের বেলায় জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে। একই সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদ্যুৎ ব্যয়ও কমতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এই সাশ্রয়ী অর্থ আবার নতুন বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগ করা সম্ভব হবে।

    শুধু সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, সাধারণ জনগণকেও এই কর্মসূচির অন্যতম অংশীদার করতে হবে। সরকার চাইলে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য সহজ শর্তে, প্রয়োজনে সুদমুক্ত বা অত্যন্ত স্বল্পসুদের অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে পারে। সেই অর্থ দিয়ে বাড়ির ছাদ, টিনের চাল বা উপযুক্ত স্থানে সোলার প্যানেল স্থাপন করা হবে। সোলার সিস্টেম স্থাপনের ব্যয় পরিবারগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি কিস্তিতে সরকারের কাছে ফেরত দেওয়ার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য ভর্তুকি এবং তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারের জন্য ঋণভিত্তিক অর্থায়নের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অর্থাৎ, ‘সবার জন্য সৌরবিদ্যুৎ’ এমন একটি জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। এতে একদিকে যেমন জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি অংশ জনগণের নিজেদের বাড়িতেই বিকেন্দ্রীভূতভাবে উৎপাদিত হবে।

    দেশের রেলওয়ে এবং লঞ্চ স্টেশনগুলোও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দেশের ৩০০-এর বেশি রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম এবং লঞ্চ টার্মিনালের ওপর থাকা শেডগুলোতে পরিকল্পিতভাবে সৌর প্যানেল স্থাপন করা যেতে পারে। রেলওয়ে এবং লঞ্চ টার্মিনাল কর্তৃপক্ষ চাইলে পর্যায়ক্রমে প্রতিটি স্টেশনের ছাদ ও অন্যান্য উপযুক্ত স্থাপনা পরিদর্শন করে কতটুকু সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, তার একটি হিসাব তৈরি করতে পারে। শুধু স্টেশন নয়, রেলওয়ের বিভিন্ন ভবন, কার্যালয়, ওয়ার্কশপ ও অন্যান্য স্থাপনাও এই কর্মসূচির আওতায় আনা যেতে পারে। এতে রেলওয়ের নিজস্ব বিদ্যুৎ চাহিদার একটি অংশ পূরণ হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপরও চাপ কমবে।

    এছাড়াও দেশের হাজার হাজার সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের বিশাল সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনের ছাদগুলো পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে।একটি বিদ্যালয় হয়তো অল্প পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। কিন্তু দেশের হাজার হাজার বিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করলে তার সম্মিলিত পরিমাণ নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য হতে পারে।এর পাশাপাশি এটি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বাস্তব শিক্ষা ক্ষেত্রও তৈরি করবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সংরক্ষণ সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে ধারণা লাভ করতে পারবে। স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি, শিক্ষক-অভিভাবক প্রতিনিধি এবং স্থানীয় প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার একটি স্বচ্ছ কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে।

    দেশের অসংখ্য মসজিদ, মন্দির ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভবনেও সৌর প্যানেল স্থাপনের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বড় মসজিদ, মডেল মসজিদ ও অন্যান্য বড় ধর্মীয় স্থাপনার ছাদকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রতিটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ চাহিদা অনুযায়ী ছোট ও মাঝারি আকারের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হলে এসব প্রতিষ্ঠান নিজেদের বিদ্যুতের একটি বড় অংশ নিজেরাই উৎপাদন করতে পারবে। এখানেও সংশ্লিষ্ট মসজিদ বা মন্দির কমিটি এবং স্থানীয় প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। তবে অবশ্যই প্রকল্পের অর্থায়ন, মালিকানা, রক্ষণাবেক্ষণ ও উৎপাদিত বিদ্যুতের হিসাব স্বচ্ছ রাখতে হবে। শুধু সোলার প্যানেল বসালেই হবে না, তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি সৌরবিদ্যুৎকে বিদ্যুৎ সংকটের একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখলে চলবে না।

    এটি হতে পারে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক উৎস। কারণ সৌরবিদ্যুৎ দিনের বেলায় সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত হয়। সন্ধ্যা ও রাতে এর উৎপাদন কমে যায়। তাই সৌরবিদ্যুতের সঙ্গে ব্যাটারি স্টোরেজ, স্মার্ট গ্রিড, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং অন্যান্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার সমন্বয় প্রয়োজন। এ ছাড়া নিম্নমানের সোলার প্যানেল বা অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। তাই সরকারকে মান নির্ধারণ, অনুমোদিত সরবরাহকারী নির্বাচন, ইনস্টলেশন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি শক্তিশালী নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। প্রয়োজন জাতীয় ‘রুফটপ সোলার মিশন’এখন প্রয়োজন বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি প্রকল্প নয়; বরং একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মসূচি। সরকার চাইলে ‘জাতীয় রুফটপ সোলার মিশন’ বা এ ধরনের একটি কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে। এর আওতায়—সরকারি অফিস-আদালত; বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানা; রেলওয়ে স্টেশন; লঞ্চ টার্মিনাল, স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়; মসজিদ, মন্দির ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান; হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র; আবাসিক ভবন এবং সাধারণ মানুষের বাড়ির ছাদ ধাপে ধাপে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার আওতায় আনা যেতে পারে।

    প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাব্য ছাদ ও স্থাপনার একটি ডিজিটাল তালিকা তৈরি করা যেতে পারে। কোথায় কত কিলোওয়াট বা মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, কত ব্যয় হবে এবং কত বছরে বিনিয়োগের অর্থ উঠে আসতে পারে তারও একটি বাস্তবসম্মত হিসাব করা প্রয়োজন।উদ্যোগের সঙ্গে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে এ ধরনের একটি বিশাল কর্মসূচি কেবল সরকারের পক্ষে একা বাস্তবায়ন করা কঠিন। তাই স্থানীয় সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মন্দির কমিটি, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ, অভ্যন্তরীন নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ জনগণকে সমন্বিতভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। সরকার অর্থায়নের পাশাপাশি নীতিগত সহায়তা ও প্রণোদনা দিতে পারে। ব্যাংকগুলো দীর্ঘমেয়াদি সহজ কিস্তির ঋণ দিতে পারে। বেসরকারি খাত প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনায় অংশ নিতে পারে। আর জনগণ হতে পারে এই বিকেন্দ্রীভূত বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় অংশীদার।

    সময় এসেছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিদ্যুৎ সংকট শুধু একটি খাতের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে শিল্প, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সরাসরি জড়িত।

    তাই সংকট দেখা দিলে শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। বিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির পাশাপাশি বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়াতে হবে।বাংলাদেশের প্রতিটি উপযুক্ত ছাদ যদি একটি ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্রে পরিণত হয়, প্রতিটি রেলওয়ে স্টেশনের শেড যদি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, প্রতিটি বড় স্কুল-কলেজ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান যদি নিজেদের বিদ্যুতের একটি অংশ নিজেরাই উৎপাদন করে তাহলে সম্মিলিতভাবে এর প্রভাব ছোট হবে না।

    প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা, সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছ অর্থায়ন এবং কঠোর বাস্তবায়ন। আজ যে ছাদগুলো খালি পড়ে আছে, আগামী দিনের বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সেই ছাদগুলোই হতে পারে আমাদের অন্যতম বড় সম্পদ। বিষয়টি নিয়ে সরকার বাহাদুর গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে পারেন।

    লেখক : আহমেদ আবু জাফর, চেয়ারম্যান, ট্রাস্টি বোর্ড, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম ও সভাপতি, সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি, বাংলাদেশ।

  • এভাবে আর কোনো পুলককে গণমাধ্যম অঙ্গন থেকে হারাতে চাই না–আহমেদ আবু জাফর 

    এভাবে আর কোনো পুলককে গণমাধ্যম অঙ্গন থেকে হারাতে চাই না–আহমেদ আবু জাফর 

    মন্তব্য কলাম: এভাবে আর কোনো পুলককে
    গণমাধ্যম অঙ্গন থেকে হারাতে চাই না।

    এভাবে আর কোনো পুলককে গণমাধ্যম অঙ্গন থেকে আমরা হারাতে চাইনা। দেশের অরক্ষিত গণমাধ্যম, অনিশ্চিত সাংবাদিকতা এবং আমাদের গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রযন্ত্রের দায় এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয় । একজন সাংবাদিক যখন আত্মহত্যার পথ বেছে নেন, তখন সত্যিই আর কিছু বলার থাকে না। তবে কিন্তু কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। যে প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়ার আদৌ সুযোগ নেই। বরং একজন সাংবাদিকের এমন করুণ মৃত্যু আমাদের গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা অঙ্গনের ভেতরে জমে থাকা অদৃশ্য সংকটগুলো নতুন করে সামনে এনে দেয়। পারবে রাষ্ট্র কি পারবে গণমাধ্যম অঙ্গনের এই অসঙ্গতি গুলো পুরোপুরি সমাধান দিতে? পুলক চ্যাটার্জী হয়তো চেয়েছিলেন বরিশালে সমকাল অফিসের মধ্যে আত্মাহুতি দিয়ে গোটা গণমাধ্যম অঙ্গনকে মুক্তি দিতে। সাংবাদিকরা কী পারবে তার সেই আত্মাহুতির অনুভূতি টের পেতে? তিনি চিরকুটে লেখে গেছেন তার সেই অনুভূতি গুলো। এখন দরকার সেই অনুভূতি গুলো নিয়ে আলোচনা করা, সমস্যার সমাধানে কাজ করা।

    বরিশালের সিনিয়র সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু তেমনই এক কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে আমাদের। পুলক চ্যাটার্জি ছিলেন দৈনিক সমকালের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বরিশালের ব্যুরো প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা একজন অভিজ্ঞ সংবাদকর্মী। তিনি বরিশাল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং ন্যাশনাল ডেইলিজ ব্যুরো চীফ অ্যাসোসিয়েশন-এনডিবিএ’র স্থানীয় সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে তিনি ছিলেন সাহসী, স্পষ্টবাদী ও দায়িত্বশীল কলমযোদ্ধা।

    শুক্রবার সন্ধ্যায় বরিশাল নগরীর প্যারারা রোডে দৈনিক সমকালের বরিশাল ব্যুরো কার্যালয় থেকে পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হলেও এর প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব। ঘটনাস্থলের ছবি, মরদেহের অবস্থান এবং তার রেখে যাওয়া সুইসাইড নোটকে ঘিরে যেসব প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোরও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। কোনো ছবি বা প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সাংবাদিকতার নীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। কিন্তু একটি মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তদন্তে নির্ধারিত হবে এটি যেমন সত্য, তেমনি সেই মৃত্যু আমাদের সামনে যে বৃহত্তর প্রশ্নগুলো রেখে যায়, সেগুলো নিয়েও গণমাধ্যম অঙ্গনের সাথে জড়িতদের কথা বলা জরুরি।

    বলুনতো, একজন সাংবাদিকের চাকরি কি শুধু একটি পদ? চাকরি হারানোর পর একজন দীর্ঘদিনের পেশাজীবীর জীবনে কী ধরনের আর্থিক, সামাজিক ও মানসিক সংকট তৈরি হতে পারে তা গোটা দেশের সামনে পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু সেই প্রশ্নটি নির্মমভাবে সামনে এনেছে। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে একজন সাংবাদিকের চাকরি অনেকের কাছে হয়তো একটি পদ, একটি বেতন কিংবা একটি কর্মসংস্থান। কিন্তু একজন সাংবাদিকের কাছে চাকরিটি তার পেশাগত পরিচয়, পরিবারের জীবিকা, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বিশেষ করে দীর্ঘদিন একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পর হঠাৎ চাকরি হারানো একজন সাংবাদিকের জন্য শুধু কর্মহীন হয়ে পড়া নয়; এটি অনেক সময় তার সমগ্র জীবনব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিতে পারে। গতকাল পুলক চ্যাটার্জীর মৃত্যুর পর থেকে বরিশাল সহ সারাদেশের সাংবাদিকদের মাঝে চাপা ক্ষোভ এবং উত্তেজনা লক্ষ্য করা গেছে।

    তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে- কোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান নিয়মনীতি উপেক্ষা করে একজন সাংবাদিককে চাকরিচ্যুত করার আগে কি একবারও ভাবেন, এই সিদ্ধান্তের পর তার পরিবার কীভাবে চলবে? তার সন্তানদের পড়াশোনা কীভাবে হবে? বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, ঋণ কিংবা নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটানোর ব্যবস্থা কী? চাকরি দেওয়া এবং চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার স্বাভাবিক এখতিয়ার হতে পারে। কিন্তু সেই এখতিয়ারের সঙ্গে কি কোনো মানবিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা থাকবে না? একজন হোটেল কর্মচারী মুদি দোকানের সেলসম্যানের বা গার্মেন্টসের শ্রমিকদের চাকরিটি কিন্তু তাৎক্ষণিক হারানোর সম্ভাবনা নেই। অথচ সাংবাদিকদের চাকরি হারানো সহজ যেন কচুপাতার পানি। এখানে নেই কোনও মানবতা বা দরদ। আছে শুধু স্টিমরোলার।

    আমাদের দেশের সাংবাদিকরা সবচেয়ে অরক্ষিত যোদ্ধা। যেমন মিডিয়া অঙ্গনে নিরাপত্তা নেই ; তেমনি নেই বাইরের নিরাপত্তা। যেনো উভয় সঙ্কটাপন্ন। দেশের গণমাধ্যমের বড় একটি অংশের সংবাদ সংগ্রহ হয় মফস্বল থেকে। মফস্বলে কর্মরত সাংবাদিকদের একটি বড় অংশই সবচেয়ে বেশি আর্থিক ও পেশাগত অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করেন। এদের ৯০ ভাগ সাংবাদিকের নেই বেতন, ভাতা, রেশন, পেনশন শুধুই টেনশন। অথচ, ওয়েজবোর্ড নামের সোনার হরিনের সাথে দেখা মেলেনা-কারোরই।

    একজন সাংবাদিক প্রতিদিন সংবাদ সংগ্রহে বের হন নিজের খরচে। তার মোবাইল বিল আছে, ইন্টারনেট বিল আছে, যাতায়াতের খরচ আছে। কখনো ইউনিয়ন পরিষদ, কখনো উপজেলা, কখনো জেলা শহর, কখনো আদালত, হাসপাতাল কিংবা দুর্গম কোনো এলাকায় ছুটতে হয় তাকে। তার নিজের সংসার আছে। সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ আছে। চিকিৎসা, বাড়িভাড়া, খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই সাংবাদিকের আয় কোথা থেকে আসবে? অনেক ক্ষেত্রেই মফস্বল সাংবাদিকরা নিয়মিত ন্যূনতম সম্মানী পর্যন্ত পান না। অথচ প্রত্যাশার যেন শেষ নেই নিউজ দাও, বিজ্ঞাপন দাও, প্রচার বাড়াও।

    একজন সাংবাদিকের শ্রমের মূল্য কত? তার মাসিক আয় কত? তার কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা কী? অসুস্থ হলে কী হবে? চাকরি চলে গেলে কী হবে? দীর্ঘদিন কাজ করার পর অব্যাহতি পেলে তার পাওনা কীভাবে পরিশোধ হবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কি গণমাধ্যম ব্যবস্থার কাছে আছে? পত্রিকার ব্যবসা থাকবে, সাংবাদিকের অধিকারও থাকতে হবে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করবে, বিনিয়োগ করবে, লাভ করবে এটি স্বাভাবিক। সংবাদপত্র ও মিডিয়া প্রতিষ্ঠানকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী এবং মানবিক হওয়াও জরুরি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ সাংবাদিক ও কর্মীদের অধিকার কেন অনিশ্চিত থাকবে?

    কোনো কোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান বড় অঙ্কের ব্যবসা ও আর্থিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। গণমাধ্যমের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ কেউ বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা বা ঋণও পেয়ে থাকে এমন অভিযোগ ও আলোচনা সমাজে রয়েছে। এসব বিষয়ে অবশ্যই সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আলোচনা হওয়া উচিত। কিন্তু বিপরীত চিত্রটি আরও বেদনাদায়ক। একদিকে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান কোটি কোটি টাকার আর্থিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারে, অন্যদিকে সেই প্রতিষ্ঠানের মাঠপর্যায়ের একজন সাংবাদিক তার মাসিক মোবাইল বিল কিংবা যাতায়াত খরচ মেটাতে হিমশিম খান। এই বৈপরীত্য কি আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে না? সাংবাদিকতা কি শুধু দায়িত্ব, নাকি পেশাও? সাংবাদিকের কাছে সাংবাদিকতা একটি দায়িত্ব এ কথা সত্য। কিন্তু সাংবাদিকতা একই সঙ্গে একটি পেশাও। আর কোনো পেশাজীবীকে তার শ্রমের ন্যায্য মূল্য ছাড়া দীর্ঘদিন কাজ করিয়ে নেওয়া হলে সেখানে পেশাগত ন্যায়বিচারের প্রশ্ন উঠবেই।

    আমাদের দেশে সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত মানুষের সংখ্যা কম নয়। কিন্তু কতজনের হাতে বৈধ নিয়োগপত্র আছে? কতজন নিয়মিত বেতন পান? কতজনের চাকরির সুনির্দিষ্ট শর্ত আছে? কতজন চাকরি হারালে ন্যায্য পাওনা পান? কতজন অবসরের পর কোনো নিরাপত্তা পান? এসব প্রশ্নের একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও সর্বজনগ্রাহ্য কাঠামো এখনই প্রয়োজন। এজন্য দরকার একটি স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন। তবে তা আদৌ কি হবে? এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিয়োগ, পদায়ন, চাকরিচ্যুতি ও পেশাগত মূল্যায়নে স্বচ্ছতার প্রশ্ন। কখনো রাজনৈতিক বিবেচনা, কখনো মালিকানা পরিবর্তন, কখনো ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত, আবার কখনো কোনো সুস্পষ্ট কারণ ছাড়াই সাংবাদিক চাকরি হারাতে পারেন এমন অভিযোগ রয়েছে। গণমাধ্যম স্বাধীন হবে এটি যেমন জরুরি, তেমনি গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকও যেন নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে পারেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন সাংবাদিক সুরক্ষার জাতীয় নীতিমালা রাষ্ট্র সাংবাদিকের হয়ে সংবাদ লিখবে না। সম্পাদকীয় নীতিতে হস্তক্ষেপ করবে না। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করবে না। কিন্তু রাষ্ট্র এমন একটি নীতিগত কাঠামো তৈরি করতে পারে, যেখানে সাংবাদিকের শ্রমের মূল্য, চাকরির ন্যায্যতা, পাওনা পরিশোধ, বৈষম্যহীনতা এবং ন্যূনতম পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। একজন সাংবাদিককে অন্যায়ভাবে বাদ দেওয়া হলে তার প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। দীর্ঘদিন কাজ করা একজন সাংবাদিক হঠাৎ চাকরিচ্যুত হলে তার পাওনা, নোটিশ, ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসনের বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকতে পারে। পুলক চ্যাটার্জিকে চাকুরীচ্যুতি করার পর সমকাল কেন তার বেতন ভাতা পরিশোধ করলেন না এটি কি একজন সাংবাদিকের সাথে অন্যায় এবং দণ্ডনীয় অপরাধ নয়? প্রতিটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব মানবসম্পদ নীতিও শক্তিশালী হওয়া দরকার। নিয়োগপত্র, নির্ধারিত বেতন-ভাতা, ছুটি, কর্মঘণ্টা, চাকরিচ্যুতির স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, ন্যায্য পাওনা, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি ও বৈষম্য প্রতিরোধ এবং সংকটকালে সহায়তার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যকে আর অবহেলার বিষয় হিসেবে দেখা যাবে না।

    চাকরি হারানো, দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়া, আর্থিক সংকট, কর্মস্থলের চাপ কিংবা পেশাগত অপমান একজন মানুষের ওপর গভীর মানসিক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজন হলে কাউন্সেলিং ও সংকটকালীন সহায়তার ব্যবস্থাও রাখা উচিত। পুলকের মৃত্যু যেন শুধু শোকের খবর হয়ে না থাকে
    পুলক চ্যাটার্জির চলে যাওয়া নিয়ে আবেগ থাকবে, শোক থাকবে, সহকর্মীদের চোখে পানি থাকবে। কয়েকদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে লেখা হবে। তারপর হয়তো আমরা আবার আগের মতো ব্যস্ত হয়ে পড়ব। তবে পুলক চ্যাটার্জীর মৃত্যুর শোককে শক্তিতে পরিণত করে গণমাধ্যম অঙ্গনকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

    পুলক চ্যাটার্জীর শোক আর শেষকৃত্য কিন্তু এখানেই শেষ হওয়া উচিত নয়। তার মৃত্যু আমাদের গণমাধ্যমের
    জন্য একটি সতর্কবার্তা। মিডিয়ায় কাজ করা এমন হাজারো ‘পুলক’ হয়তো আজ নীরবে-নিভৃতে দগ্ধ হচ্ছেন। কেউ চাকরি হারানোর আতঙ্কে, কেউ বেতন-সম্মানীর অনিশ্চয়তায়, কেউ পারিবারিক সংকটে, কেউ পেশাগত অবমূল্যায়নে, আবার কেউ ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন। আমরা তাদের কতজনের খবর রাখি বা রাখছেন? প্রতিনিয়ত আমার কাছে সারাদেশের বিভিন্ন সাংবাদিকের নানা কষ্ট গাঁথা বেদনাদায়ক গল্প শোনতে হয়, শুনছি। কিন্তু কিছু করতে পারছিনা, সংকট চারিদিকে। কারো বেতন নেই, কারো চাকরি নেই কাউকে ডেক্স থেকে চাকরিচ্যুতির ভয় দেখানো হচ্ছে, কত কি? গণমাধ্যমের মালিক পক্ষ তৃণমূলের সাংবাদিকদের বেতন ভাতা না দিতে সেন্ট্রাল ডেস্কে অপ্রয়োজনীয় লোকজন-ক্যাডার নিয়োগ দিয়ে হয়রানি করছেন, এমন মিডিয়ার সংখ্যাও কম নেই।
    একজন সাংবাদিককে শুধু সংবাদ সংগ্রহের সময় প্রয়োজন হয় না। তার প্রয়োজন হয় নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য পারিশ্রমিক, সম্মান, চাকরির নিশ্চয়তা এবং বিপদের সময়ে সহায়তার হাত।

    আমরা কি এমন একটি গণমাধ্যম চাই, যেখানে সাংবাদিক প্রয়োজনের সময় গুরুত্বপূর্ণ, আর প্রয়োজন শেষ হলে পরিত্যক্ত? নাকি এমন একটি গণমাধ্যম চাই, যেখানে মালিক ও সাংবাদিকের মধ্যে পেশাগত সম্পর্কের পাশাপাশি মানবিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতাও থাকবে? সময় এসেছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। এতটুকুও জানি যে, আমার এ লেখাটি অনেক মিডিয়ার কাছে খারাপ লাগবে, গাত্রদাহ হবে তাই ছাপাবেন না, তবুও না বলা কথা গুলো লিখতে বাধ্য হলাম এবং লিখবো। তবে পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তদন্তে বেরিয়ে আসুক। সত্য যা-ই হোক, তা জাতির সামনে স্বচ্ছভাবে প্রকাশিত হোক। কিন্তু একই সঙ্গে তার মৃত্যু যে প্রশ্নগুলো সামনে এনেছে, সেগুলোও জাতীয় আলোচনার বিষয় হোক। কীভাবে আমাদের অরক্ষিত গণমাধ্যম অঙ্গনকে সুরক্ষিত করা যায়? কীভাবে সাংবাদিকতার কর্ম এবং এই পেশাটিকে রক্ষা করা যায়? এখনই সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। রাষ্ট্রকে নীতিমালা করতে হবে, গণমাধ্যম মালিকদের দায়িত্বশীল হতে হবে, সম্পাদকদের মানবিক হতে হবে এবং সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে শুধু প্রতিবাদ-বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে সাংবাদিকদের জন্য কার্যকর নিরাপত্তাবলয় গড়ে তুলতে হবে, সাংবাদিক সংগঠনের নামে দোকানদারি করলে চলবেনা। কারণ আর কোনো সাংবাদিক যেন পেশাগত অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট, চাকরি হারানোর ভয় কিংবা একাকিত্বের অন্ধকারে হারিয়ে না যান। আর কোনো পুলক চ্যাটার্জিকে আমরা হারাতে চাই না।

    মনে রাখা উচিত, সাংবাদিক বাঁচলে সাংবাদিকতা বাঁচবে। সাংবাদিকতা বাঁচলে গণমাধ্যম বাঁচবে। আর গণমাধ্যম বাঁচলে মানুষের কথা বলার শক্তিটুকুও বেঁচে থাকবে, গণতন্ত্র রক্ষা পাবে।

    লেখক: আহমেদ আবু জাফর, চেয়ারম্যান, ট্রাস্টি বোর্ড, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম ও সভাপতি, সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি, কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রী: ০১৭১২৩০৬৫০১।

  • ক্ষুদ্র ব্যবসা থেকে বড় ঋণ চাপে পতন: কেন ব্যবসায়ীরা একই ফাঁদে পড়ছেন

    ক্ষুদ্র ব্যবসা থেকে বড় ঋণ চাপে পতন: কেন ব্যবসায়ীরা একই ফাঁদে পড়ছেন

    মো: আল মাসুম খান,বার্তা সম্পাদক।

    বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) খাতে ঋণনির্ভর ব্যবসার বিস্তার যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে ঋণঝুঁকি ও খেলাপির সংখ্যা। শুরুতে স্বাভাবিক ভাবে চলা অনেক ব্যবসা ধীরে ধীরে বড় ঋণচাপে পড়ে যাচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা সম্পদ নিলামে ওঠার মতো পরিস্থিতিতে গড়াচ্ছে।

    ব্যাংকিং খাত ও সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই ধরনের পতন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্নে অনেক ব্যবসা একই পথে এগোচ্ছে।

    ব্যবসায়ীরা সাধারণত Black Plate Sheet (BP Sheet) বা অনুরূপ শিল্পপণ্য দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। এই পণ্য বাস ট্রাক বডি, শিপ ফ্যাব্রিকেশন, কন্টেইনার ও রুফিং শিল্পে ব্যবহৃত হয়। একই সঙ্গে নির্মাণ খাতে পাথর, বিটুমিনসহ বিভিন্ন আমদানি পণ্যও ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ব্যবসার মূল অংশ হিসেবে থাকে।

    প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যবসার চিত্র থাকে স্বাভাবিক। পণ্য বৈধ, গ্রাহক নিয়মিত, বাজারে চাহিদা থাকে এবং ব্যাংক লেনদেনও স্বাভাবিক থাকে।

    তবে মূল সংকট দেখা দেয় working capital ঘাটতিতে।

    সরবরাহকারীদের অগ্রিম পরিশোধ করতে হলেও অনেক ক্রেতার কাছ থেকে বাকি পাওয়ার কারণে নগদ প্রবাহে ঘাটতি তৈরি হয়।
    এই ঘাটতি পূরণে ব্যাংক থেকে working capital লিমিট নেওয়া হয়। শুরুতে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকার সীমা থেকে তা ধীরে ধীরে কয়েক কোটি টাকায় পৌঁছে যায়।

    উল্লেখ্য, ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, প্রাথমিক ভাবে এটি স্বাভাবিক ব্যবসা সম্প্রসারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
    লিমিট বাড়ার পর কিছু ব্যবসায়ী ব্যাংক ফাইন্যান্স ব্যবহার করে কেবল নিজের ব্যবসা নয়, বরং তৃতীয় পক্ষের বাণিজ্যিক কার্যক্রমেও যুক্ত হন।

    একাধিক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, LC খুলে আমদানি কার্যক্রম পরিচালনা করা হলেও প্রকৃত ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণ থাকে অন্য পক্ষের হাতে।
    ব্যাংকিং সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে জানান, অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকরা কমিশন বা অতিরিক্ত আয়ের আশায় নিজের লিমিট ব্যবহার করে অন্যের ব্যবসা পরিচালনায় অংশ নেন। এতে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ গ্রাহকের হাত থেকে সরে যায়।

    প্রথমদিকে লেনদেন স্বাভাবিক থাকলেও পরবর্তী সময়ে ঝুঁকি বাড়তে থাকে। ব্যবসার এক্সপোজার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায় ঋণের পরিমাণ বাড়ছে কিন্তু নগদ প্রবাহ সেই অনুপাতে বাড়ছে না। স্টক ও বিক্রির মধ্যে অমিল তৈরি হয় এবং পাওনা আদায় অনিয়মিত হয়ে পড়ে।

    একই সময়ে অনেক ব্যবসায়ীর জীবন যাত্রায় পরিবর্তন দেখা যায়। নতুন গাড়ি, বাড়ি নির্মাণ এবং অতিরিক্ত ব্যয় ব্যবসার নগদ প্রবাহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে না।

    অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত। ব্যবসার আয় না বাড়লেও ব্যক্তি গত ব্যয় বাড়লে ঋণনির্ভরতা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছে যায়।

    ব্যাংক যখন নগদ প্রবাহ, স্টক এবং লেনদেনে অসঙ্গতি শনাক্ত করে তখন সীমিতকরণ বা সতর্কতা জারি করে। তবে অনেক ব্যবসায়ী এটিকে সহযোগিতা হিসেবে না দেখে বাধা হিসেবে বিবেচনা করেন।

    এরপর অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক পরিবর্তনের প্রবণতা দেখা যায়। এক ব্যাংক ঝুঁকি সংকেত দিলে ব্যবসায়ী অন্য ব্যাংকে যান, যেখানে তুলনা মূলক ভাবে বেশি লিমিট অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে মোট ঋণ এক্সপোজার আরও বেড়ে যায়।

    এক পর্যায়ে ব্যবসা বড় আকার ধারণ করলেও ভেতরে ভেতরে সংকট ঘনীভূত হতে থাকে। পাওনা আটকে যায়, চেক ডিজঅনার হয়, LC দায় পরিশোধে ব্যর্থতা তৈরি হয় এবং ব্যাংক ঋণ অনিয়মিত হয়ে পড়ে।

    ব্যাংক তখন আইনগত পদক্ষেপ নেয় এবং মর্টগেজ সম্পত্তি নিলামে তোলে। অনেক ক্ষেত্রে পুরো দায় সমন্বয় সম্ভব হয় না।
    ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, SME খাতে খেলাপি হওয়ার পেছনে কিছু সাধারণ কারণ রয়েছে।
    প্রথমত, ঋণকে ব্যবসার বিকল্প হিসেবে দেখা হয়। দ্বিতীয়ত, নগদ প্রবাহ বিশ্লেষণে দুর্বলতা থাকে। তৃতীয়ত, তৃতীয় পক্ষের প্রভাব ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করে। চতুর্থত, সহজ লাভের প্রত্যাশা কাজ করে। পঞ্চমত, ব্যক্তিগত ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ষষ্ঠত, পাওনা ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা দেখা দেয়।

    একজন সিনিয়র ব্যাংকার বলেন, অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা ঋণ দেওয়া নয়, বরং সেই ঋণের ব্যবহার এবং নিয়ন্ত্রণের অভাব।
    বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের SME খাতে অনেক ব্যবসার পতন হঠাৎ ঘটে না। এটি একটি ধীর প্রক্রিয়া, যেখানে শুরুতে থাকে প্রবৃদ্ধি, এরপর অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ, পরে নিয়ন্ত্রণ হারানো এবং শেষ পর্যন্ত নগদ প্রবাহ ভেঙে পড়া।

    অর্থনীতিবিদদের মতে, টেকসই ব্যবসার মূল ভিত্তি হলো ঋণ নয়, বরং নগদ প্রবাহ এবং আর্থিক শৃঙ্খলা।
    মতামত ও নীতিগত দাবি
    ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য LC সুবিধা নিয়ে বর্তমান ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করছেন অনেক উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী মহল। তাঁদের মতে, বিদ্যমান কাঠামোয় তুলনা মূলক ভাবে বড় ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরা বেশি সুবিধা পেলেও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা অনেক ক্ষেত্রে একই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

    বিশেষ করে নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে ব্যবহৃত পাথর, বিটুমিন সহ গুরুত্বপূর্ণ আমদানি পণ্যের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ ও ন্যায্য LC সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। অনেক ব্যবসায়ী মনে করেন, ভোমরা ও বেনাপোল সহ সীমান্ত বন্দর দিয়ে ভারত থেকে পাথর আমদানির ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র আমদানিকারকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে LC সুবিধা দেওয়া হলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং নতুন উদ্যোক্তারা টিকে থাকার সুযোগ পাবেন।
    ব্যবসায়ীদের দাবি, বর্তমানে LC সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য থাকায় নতুন ও ছোট ব্যবসায়ীরা বাজারে প্রবেশ করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়ছেন। এতে করে একটি সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যেই আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থা কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে।

    অনেকেই মনে করেন, ব্যাংকিং নীতিমালায় এমন পরিবর্তন আনা প্রয়োজন যাতে সকল উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীর জন্য সমানভাবে LC সুবিধা নিশ্চিত করা যায়। একই সঙ্গে ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতে স্বচ্ছ ও সহজ প্রক্রিয়ায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরও সময়োপযোগী সুবিধা দেওয়া গেলে দেশে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে এবং কর্মসংস্থান বাড়বে।

    অর্থনীতিবিদদের মতে, নীতিগত ভাবে ব্যাংকিং খাতে অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবর্তন আনা গেলে একদিকে যেমন আমদানি নির্ভর খাতে প্রতিযোগিতা বাড়বে, অন্যদিকে ছোট ব্যবসায়ীরাও বড় বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবেন।

  • কাপ্তাইয়ে কোরবানির পশু’র  হাটে পাহাড়ি গরুর কদর বেশি

    কাপ্তাইয়ে কোরবানির পশু’র  হাটে পাহাড়ি গরুর কদর বেশি

    কাপ্তাই প্রতিনিধি। 

    রাঙামাটি কাপ্তাই উপজেলার ৪নম্বর ইউনিয়ন ৫নং ওয়ার্ডের আনন্দ মেলা মাঠে শুরু হয়েছে কোরবানি পশু ক্রয়বিক্রয়ের হাট। পবিত্র ঈদুল আজহার বাকিমাত্র কয়েক দিন ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে পশু ক্রয়/বিক্রয় এর নানা প্রস্তুতি।

    পাহাড়ি গরুর কদর বেশি। সকলের  নজর পাহাড়ি পশুর দিকে। রবিবার কাপ্তাই নতুন বাজার আনন্দ মেলা মাঠে পশু হাটে গিয়ে দেখা যায় নানা রঙের গরু নিয়ে পসরা বসেছে। বেশির ভাগ গরু রাঙামাটি জেলার বিলাইছড়ি, জুড়াছড়ি, বরকল ও লংগদুসহ পাহাড়ি এলাকার আশপাশ হতে বেপারীরা বিক্রয়ের জন্য নতুন বাজার হাটে নিয়ে আসছে। গরু ব্যবসায়ী রমজান আলী জানান, কাপ্তাই লেকের পানি শুকিয়ে যাওয়ার ফলে পাহাড় থেকে গরু আনতে খুব কষ্ট হচ্ছে। গরুর দাম কেমন জানতে চাইলে তিনি জানান এবার  একটু বেশি। কারন জানতে চাইলে তিনি জানান,বিভিন্ন জিনিস পত্র  ও দ্রব্যমূল্যর দাম বৃদ্ধি পাশাপাশি গরুর দামও একটু বেশি বলে উল্লেখ করেন।

    চট্টগ্রাম জেলার রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলা থেকে গরু ক্রয় করতে আসা  আব্দুল মান্নান ও ইলিয়াস জানান, আমরা পাহাড়ি গরু কিনতে আসছি। কারন পাহাড়ি গরু ন্যাচারাল খাবার খায়। চর্বি কম এবং মোটাতাজা। পাহাড়ি গরুর তেমন একটা অসুস্থ হয়না। বা এসকল গরুকে ইনজেকশন দিয়ে মোটাতাজা করা হয়না। যার ফলে পাহাড়ি গরুর কদর  সকলের কাছে বেশি। গরু বিক্রয় করতে আসা মামুন, নফর আলী, বাবু ও করিম জানান,আমরা কয়েকজন মিলে গরুর খামার করেছি এবং এবার খামারের গরু হাটে বিক্রয়ের জন্য আনছি।তাদের  এক একটা গরু দেড় লাখ হতে দু’লাখ টাকা হাকা হচ্ছে। সামান্য কিছু লাভ হলে ছেড়ে  দিবে বলে জানান। ব্যবসায়ী আবুল কালাম জানান, পাহাড় থেকে বেশির ভাগ পশু পাশ্ববর্তী উপজেলা, রাঙ্গুনিয়া, রাউজান ও চট্টগ্রামে ছোট, বড় গাড়িতে নেয়া হচ্ছে।

    কাপ্তাই উপজেলা প্রাণী সম্পাদ কর্মকর্তা ডক্টর এনামুল হক হাজারী জানান, কাপ্তাই উপজেলায় এবার ২০২৬ সালে  কোরবানির ঈদের মোট পশুর  চাহিদা ৬হাজার ২শ’,উদ্বৃত্ত আছে এক হাজার ১৭৭টিরমত। তিনি আরও জানান,উপজেলা প্রাণী সম্পাদের পক্ষ হতে পশু পরীক্ষা -নিরিক্ষার জন্য কাপ্তাই নতুন বাজার আনন্দ মেলা গরুর হাটে ঈদের ৪/৫দিন আগে মেডিকেল টিম থাকবে। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং জাল টাকার বিষয়ে সচেতনামূলক কাজ করবে বলে জানান।

  • সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়, এটি ন্যায়, সাহস ও মানবতার পক্ষে এক অবিরাম কলম যুদ্ধ

    সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়, এটি ন্যায়, সাহস ও মানবতার পক্ষে এক অবিরাম কলম যুদ্ধ

    সাংবাদিক সাফায়েত হোসেন।

    সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়, এটি ন্যায়, সাহস ও মানবতার পক্ষে এক অবিরাম কলমযুদ্ধ। বাংলাদেশের সাংবাদিকরা জাতির বিবেক সমাজের অন্যায়, দুর্নীতি ও অসত্যের বিরুদ্ধে সত্য প্রকাশে নিরলসভাবে কাজ করে চলেন।
    সাংবাদিকের কলম যেন রক্তের মতোই পবিত্র, কারণ সেই কলমের শক্তিতেই উঠে আসে মানুষের অধিকার, সমাজের বাস্তবতা এবং ন্যায়বিচারের দাবি। দেশের সাধারণ মানুষ সাংবাদিকদের প্রতি আস্থা, বিশ্বাস ও ভরসা রাখে, কারণ তারাই সত্য উদঘাটনে নির্ভীক ভূমিকা পালন করেন।
    প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, অন্যায় কিংবা জনদুর্ভোগের পেছনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে সাংবাদিকরা নিরলস পরিশ্রম করেন। সত্য প্রকাশের এই পথ কখনো সহজ নয়, তবুও সাহসী সাংবাদিকরা দেশের স্বার্থে, মানুষের অধিকারের পক্ষে এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠায় নিজেদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
    সত্য, ন্যায় ও মানবতার পক্ষে সাংবাদিকতার এই কলমযুদ্ধ চলবে কারণ সত্যের শক্তিই একটি সুন্দর, সচেতন ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম প্রধান ।

  • কে রাখে খবর — মোহাম্মদ হাসানুর রহমান

    কে রাখে খবর
    – মোহাম্মদ হাসানুর রহমান

    হিরোশিমা-নাগাসাকি কেন পোড়া মাটি, কে দেবে জবাব
    ধ্বংস-বিভিষিকা লিটলবয়-ফ্যাটম্যান, তবু পেয়েছে সম্মান
    বিদ্বেষ বিভাজন শোষকের হাতিয়ার সভ্যতা গুমরে কাঁদে
    হিংস্র নিপীড়ক নেতানিয়াহু-হিটলার রক্তের হোলি খেলে।

    ড্রোন-মিসাইল-লেজার-কামান, যুদ্ধে মরে জওয়ান
    ধ্বংসস্তুপে বারুদের গন্ধ, জ্বলেপুড়ে খাক জনপদ,
    কি দোষ করেছে অবুঝ শিশু, প্রকৃতি-পশুপাখি-গুল্মলতা
    তবু কেন তারা অকালে মরে, বারেবারে হারায় আবাসন।

    ধূসর কালো আঁধার নীল- শোনায় বিষণ্ণতার গল্প
    কৃষ্ণচূড়া সোনালু জারুল দেখায় এগিয়ে চলার স্বপ্ন।
    সাগর বোঝে না মৃগতৃষ্ণিকা, ঝর্ণা দেখে না পাহাড়ের কান্না
    সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা অনুভূত হয় দারিদ্রতায়।

    ঋতুরানী শরৎ তবু সাজে রঙে, শীত-বসন্ত ফিরে ফিরে আসে
    মুছে যায় যত ধ্বংসের চিহ্ন, জলে ধুয়ে যায় বারুদের গন্ধ
    ফুলে-ফলে ভরে মৃত জনপদ, বাতাসে দোলে ফসলের মাঠ
    মায়াবী রাতের জ্যোৎস্না আলোয় জোয়ার-ভাটা নাচে।

    হয়তো কারো হারায়েছে স্বজন, নেশায় ডুবেছে মরদ জোয়ান
    শিকল পায়ের বাধ্য দাসী কুলি-কামিন কাঁদে
    জঠর জ্বালায় নবযৌবনা কেন ঘুঙুর পায়ে নাচে
    কে রাখে বলো খবর, ক’জন রাখে তার খবর।

  • কাপ্তাইয়ে লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ এসএসসি পরীক্ষার্থীরা

    কাপ্তাইয়ে লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ এসএসসি পরীক্ষার্থীরা

    কাপ্তাই প্রতিনিধি। 

    আলোর নিচে অন্ধকার। যেখানে স্বল্প মূল্যে পানি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়ে ন্যাশনাল গ্রিডে যুক্ত হয় সেখানে বিদ্যুৎ নেই।

    রাঙামাটি জেলার কাপ্তাই উপজেলা গড়ে  ১২/১৪ঘন্টা  বিদ্যুৎতের লোডশেডিং হচ্ছে। ফলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। চলতি এপ্রিল মাস হতে সারা দেশের ন্যায় কাপ্তাইয়ে শুরু হয়েছে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা। পরীক্ষা চলাকালীন সময়  প্রতিনিয়ত বিদ্যুৎ যাওয়া আসার ফলে শিক্ষার্থীদের পড়া লেখায় সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।

    এসএসসি পরীক্ষার্থী পাভেল হোসেন,শারমিন জাহান এরা জানান, রাতে কিংবা দিনে পড়তে বসলেই বিদ্যুৎ চলে যায়। যার ফলে  প্রচন্ড গরমে পড়া হয়না। আমরা জানিনা পরীক্ষায় ফলাফল কি হয়।

    প্রতিনিয়ত  লোডশেডিং জন্য অভিভাবক  ফিরোজ মিয়া,সলেমান হোসেন গভীর উদ্বেগ ও হতাশ প্রকাশ করে।তারা  জানান, প্রতিনিয়ত লোডশেডিং হওয়ার দরুণ শিক্ষার্থীরা প্রচন্ড গরমে পড়া লেখায় মনোনিবেশ করতে পারছে না। আমরা চাই পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ বিদ্যুৎতের যেন লোডশেডিং না দেয়। লোডশেডিং এর ফলে সরকারি /বেসরকারি বিভিন্ন শিক্ষা, শিল্প কলকারখানা, ব্যাংক,বীমা, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান  ও হাসপাতালে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে।

    কয়েক’টি কারখানা মালিক জানান, সঠিক সময় কাজ ডেলিভারি দিতে না পাড়ায় অর্ডার বাতিল হচ্ছে। ফলে আমরা অর্থনৈতিকভাবে সমস্যায় পড়ছি।

    এদিকে কাপ্তাই  কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র যেখানে ২৩০মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়ে ন্যাশনাল গ্রিডে যুক্ত হয়। সেখান এখন  পানি স্বল্পতার ফলে মাত্র বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে ৩০থেকে ৪০মেগাওয়াট। যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় আর সেখানেই ঘন্টার পর ঘন্টা বিদ্যুৎ বিহীন থাকতে হয়। এ যেন আলোর নিচে অন্ধকার।

    কাপ্তাই বিদ্যুৎ সরবরাহ  ভারপ্রাপ্ত আবাসিক প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জানান,লোডশেডিং এর কথা স্বীকার করে বলেন, আমাদের দুটি লাইন একটা বন্ধ করে আবার একটা চালু করা হয়। পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা চলাকালীন কোন সমস্যা হবেনা বলে জানান। এবং সমস্যা বেশি দিন থাকবেনা বলেও মন্তব্য করেন।

  • কাউখালীতে পল্লী বিদ্যুতের জোনাল অফিস না থাকায় ভোগান্তিতে গ্রাহকরা

    কাউখালীতে পল্লী বিদ্যুতের জোনাল অফিস না থাকায় ভোগান্তিতে গ্রাহকরা

    কাউখালী প্রতিনিধি।
    পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলায় পল্লী বিদ্যুতের কোনো জোনাল অফিস না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় গ্রাহকরা। বিদ্যুৎ সংযোগ, বিল সংক্রান্ত জটিলতা কিংবা লাইন সমস্যার সমাধানের জন্য গ্রাহকদের দূরবর্তী অফিসে যেতে হচ্ছে, ফলে সময় ও অর্থ—দুইয়েরই অপচয় হচ্ছে।
    স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার হাজারো গ্রাহক বিদ্যুৎ সেবা পেলেও প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণের জন্য নির্দিষ্ট কোনো জোনাল অফিস না থাকায় তাদের নির্ভর করতে হচ্ছে পিরোজপুর জেলার হুলারহাট জোনাল অফিসের ওপর। এতে করে ছোটখাটো সমস্যার সমাধান করতেও দিন পার হয়ে যাচ্ছে।
    ভুক্তভোগী একাধিক গ্রাহক জানান, বিদ্যুৎ বিল সংশোধন, নতুন সংযোগ বা মিটার সংক্রান্ত যেকোনো কাজে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। অনেক সময় অফিসে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে ফিরে আসতে হয়। এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়ছে।
    এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
    এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত সময়ের মধ্যে কাউখালী উপজেলায় একটি পল্লী বিদ্যুতের জোনাল অফিস স্থাপন করা হোক, যাতে তারা সহজেই প্রয়োজনীয় সেবা পেতে পারে এবং ভোগান্তি থেকে মুক্তি পায়।
  • ঘুষ, নির্যাতন ও মোবাইল কোর্ট; ন্যায় বিচারের কাঠগড়ায় রাষ্ট্রযন্ত্র–আহমেদ আবু জাফর

    ঘুষ, নির্যাতন ও মোবাইল কোর্ট; ন্যায় বিচারের কাঠগড়ায় রাষ্ট্রযন্ত্র–আহমেদ আবু জাফর

    বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকের মৌলিক অধিকার, আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দেয়। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান পুলিশ, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা এসব অধিকার রক্ষার জন্যই প্রতিষ্ঠিত।

    কিন্তু বাস্তবতার মাটিতে মাঝে মাঝে এমন কিছু ঘটনা সামনে আসে, যা এই মৌলিক আদর্শকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং সাধারণ মানুষের মনে গভীর হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার একটি সাম্প্রতিক ঘটনা তেমনই এক বিতর্ক ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে, যা শুধু একটি পরিবারের দুর্ভোগ নয়; বরং রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী ও প্রশাসনিক কাঠামোর মানবিকতা, জবাবদিহিতা এবং ন্যায়বিচারের চর্চা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে।

    ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছেন জুবাইদা জন্নাত নামের এক তরুণী। তার জীবনকাহিনি বাংলাদেশের বহু অসহায় নারীর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। জন্মের কয়েক মাস পরই তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, যৌতুকের দাবিতে তার মাকে মারধর ও নির্যাতন করতেন তার বাবা। এই নির্যাতনের কারণেই ১৯৯৯ সালে জুবাইদার মা রেহেনা জন্নাত রানু আদালতের দ্বারস্থ হন। পরে মামলার আপোষ হলেও মা-মেয়ের জীবন আর স্বাভাবিক পথে ফিরে যায়নি। জুবাইদা বড় হয়েছেন মায়ের কাছেই, চকরিয়ায়। আর্থিক কষ্ট, সামাজিক চাপ এবং পারিবারিক সংকটের মধ্য দিয়েই তার বেড়ে ওঠা।

    জুবাইদার মা কঠোর পরিশ্রম করে তাকে লেখাপড়া করিয়েছেন। বর্তমানে তিনি একটি কলেজে অনার্সে অধ্যয়ন করছেন। কিন্তু জীবনের এই পর্যায়ে এসে তাকে এমন একটি লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হয়েছে, যা তার অস্তিত্ব ও পরিচয়ের প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত।
    জুবাইদার পিতা মৃত্যুবরণ করার পর সামনে আসে পৈতৃক সম্পত্তির বিষয়টি। ইসলামী উত্তরাধিকার আইন এবং বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী একজন সন্তান হিসেবে তিনি তার পিতার সম্পত্তিতে আইনগতভাবে অংশীদার। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

    অভিযোগ রয়েছে, তার চাচা, জেঠা এবং চাচাতো ভাইরা তাকে সেই অধিকার দিতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে তিনি ন্যায়বিচারের আশায় আদালতের শরণাপন্ন হন। আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে পাঠায়। প্রথমে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পেকুয়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ডকে। পরে তিনি বিষয়টি তহসিলদারের কাছে তদন্তের জন্য দেন। কিন্তু দীর্ঘ সাত-আট মাস কেটে গেলেও কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত বা কার্যকর অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বরং এই দীর্ঘসূত্রতা ভুক্তভোগী পক্ষকে আরও অসহায় করে তোলে।

    একই সময় জুবাইদা ওয়ারিশ সনদ পাওয়ার জন্য ইউনিয়ন পরিষদের দ্বারস্থ হন। কিন্তু সেখান থেকেও তিনি কোনো সহযোগিতা পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে। পিতৃপরিচয় ও ওয়ারিশ সনদের মতো একটি মৌলিক বিষয়ে একজন নাগরিক যদি প্রশাসনিক জটিলতার মধ্যে পড়ে দীর্ঘদিন ঘুরে বেড়ান, তাহলে তা রাষ্ট্রীয় সেবাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকেই সামনে আনে।

    অবশেষে নিরুপায় হয়ে জুবাইদা আদালতে তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তনের আবেদন করেন। আদালত সেই আবেদন গ্রহণ করে এবং নতুন করে পেকুয়া থানাকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়। এই পর্যায়ে তদন্তের দায়িত্ব পান উপপরিদর্শক (এসআই) পল্লব।
    এখানেই শুরু হয় ঘটনাটির সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়।

    অভিযোগ অনুযায়ী তদন্ত প্রতিবেদন ভুক্তভোগী পক্ষের অনুকূলে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে এসআই পল্লব জুবাইদা ও তার মায়ের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। বলা হয়, টাকা না দিলে প্রতিবেদন বিপক্ষে যাবে। দরিদ্র মা-মেয়ে বহু কষ্টে সেই টাকা জোগাড় করে দেন। কিন্তু পরে যখন তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়, তখন দেখা যায় তা আসামিদের পক্ষে গেছে।

    প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়নি এবং কোনো সাক্ষীও পাওয়া যায়নি। অথচ আদালতে জমা দেওয়া জন্মসনদসহ বিভিন্ন নথিতে জুবাইদার পিতার নাম ও পরিচয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

    এই পরিস্থিতিতে জুবাইদা ও তার মা নিজেদের প্রতারিত মনে করেন। তারা পেকুয়া থানার ওসি এবং সংশ্লিষ্ট সার্কেল কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে এসআই পল্লবের বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ তোলেন এবং তাদের দেওয়া টাকা ফেরত চান। এরপর যা ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে, তা আরও উদ্বেগজনক।

    জানা যায়, গত ৫ মার্চ ২০২৬ তারা থানায় গিয়ে সেই টাকা ফেরত চাইলে উল্টো পুলিশি নির্যাতনের শিকার হন। পরে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) আদালতে হাজির করা হয় এবং এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

    “যদিও আমি গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার বাইরে কোন ইস্যু নিয়ে লেখালেখি করিনা। তবে পেকুয়ার ঘটনাটি গতকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চরম বিতর্কিত পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। বিষয়টি নিয়ে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ জরুরী হয়ে গেছে। কেননা, একক কারো জন্য একটি রাষ্ট্রীয় বাহিনী এবং খোদ একটি জনপ্রশাসন প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে না”।

    এখানেই মূল প্রশ্নগুলো সামনে আসে। প্রথম প্রশ্ন হলো যদি ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে এটি কেবল একটি ব্যক্তিগত অনৈতিকতার ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর মানুষের আস্থাকে গভীরভাবে আঘাত করে। পুলিশ জনগণের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত। সেখানে যদি ঘুষ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় গিয়ে বিচার চাইবে?

    দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো মোবাইল কোর্টের ব্যবহার নিয়ে। মোবাইল কোর্ট সাধারণত তাৎক্ষণিক অপরাধ দমন বা প্রশাসনিক আইন প্রয়োগের জন্য ব্যবহৃত হয়। যেমন ভেজালবিরোধী অভিযান, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, পরিবেশ আইন লঙ্ঘন ইত্যাদি ক্ষেত্রে এটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কিন্তু কোনো বিরোধ বা অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরাসরি মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে কারাদণ্ড দেওয়া হলে তা কতটা ন্যায়সংগত এবং আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এই প্রশ্ন উঠতেই পারে।

    তৃতীয় প্রশ্নটি আরও মানবিক। একজন এতিম কন্যা যদি তার পিতৃপরিচয় ও উত্তরাধিকার নিশ্চিত করার জন্য দীর্ঘদিন লড়াই করেন, প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ান, ঘুষের অভিযোগ তোলেন আর শেষ পর্যন্ত উল্টো কারাগারে যেতে হয়। তাহলে সেটি সমাজের জন্য কী বার্তা বহন করে?

    বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান এবং আইনের সমান সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী। একই সঙ্গে সংবিধান নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দেয়। কিন্তু বাস্তবে যদি একজন নাগরিক নিজের পরিচয় ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করতে গিয়ে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, তাহলে তা অবশ্যই গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

    এ ধরনের ঘটনা আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও সামনে আনে, জবাবদিহিতা। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা থাকা জরুরি। কারণ ক্ষমতা যখন জবাবদিহিতার বাইরে চলে যায়, তখনই অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হয়। এখানে আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। সমাজে নারীরা, বিশেষ করে একক মায়ের সন্তানরা, প্রায়ই উত্তরাধিকার ও সামাজিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে নানা বাধার মুখে পড়েন। আইনের চোখে তারা সমান অধিকারী হলেও সামাজিক বাস্তবতায় তাদের সেই অধিকার আদায় করতে গিয়ে নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়।

    পেকুয়ার এই ঘটনাটি তাই কেবল একটি পারিবারিক বিরোধ নয়; এটি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, আইনের শাসন এবং মানবিকতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।
    এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো নিরপেক্ষ তদন্ত। অভিযোগগুলো সত্য না মিথ্যা তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব রাষ্ট্রেরই। যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় যে ভুক্তভোগী মা-মেয়ের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করা হয়েছে বা ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে মোবাইল কোর্টের ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আইনি ও নৈতিক দিকগুলো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

    ন্যায়বিচার শুধু আদালতের রায় নয়; এটি মানুষের বিশ্বাসের বিষয়ও। মানুষ যখন মনে করে রাষ্ট্র তার পাশে আছে, তখনই আইনের শাসন শক্তিশালী হয়। কিন্তু যখন তারা মনে করে তাদের অভিযোগ শোনার কেউ নেই, তখন সেই বিশ্বাস দুর্বল হয়ে পড়ে।

    বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয় বারবার। সেই নীতির বাস্তব প্রতিফলন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

    পেকুয়ার এই ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ন্যায়বিচার শুধু শক্তিশালীদের জন্য নয়; এটি দুর্বল ও অসহায় মানুষের জন্যও সমানভাবে নিশ্চিত হতে হবে। একজন নাগরিক তার পিতৃপরিচয় ও উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করলে তাকে দোষী নয়, বরং সহানুভূতির চোখে দেখা উচিত।
    আজ প্রয়োজন সত্য উদঘাটন, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা। কারণ আইনের শাসনের মূল দর্শন একটাই কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয় এবং কোনো নাগরিকই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন না।

    লেখক: আহমেদ আবু জাফর, চেয়ারম্যান, ট্রাস্টি বোর্ড, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম, ০১৭১২৩০৬৫০১, ৬ মার্চ ২০২৬ খ্রী:

  • রমজানে সাংবাদিক পরিবারের কান্না: মানবিক দৃষ্টিতে মুক্তির সিদ্ধান্ত হোক

    রমজানে সাংবাদিক পরিবারের কান্না: মানবিক দৃষ্টিতে মুক্তির সিদ্ধান্ত হোক

    স্টাফ রিপোর্টার।

    পবিত্র মাহে রমজান সংযম, সহমর্মিতা, আত্মশুদ্ধি ও ক্ষমার মাস। এ মাসে সমাজের বিত্তবান ও সক্ষম মানুষ অসহায়দের পাশে দাঁড়ান, রাষ্ট্রও নেয় বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগ। অথচ বেদনাদায়ক হলেও সত্য এই পবিত্র মাসেই দেশের বিভিন্ন স্থানে কারাবন্দী ও পলাতক সাংবাদিকদের পরিবার চরম দুর্দশার মধ্যে দিনাতিপাত করছে। অনেক পরিবারে সেহরি ও ইফতারের ন্যূনতম সামগ্রীও জুটছে না। শিশুদের মুখে খাবার তুলে দিতে না পেরে মায়েদের কান্না, বৃদ্ধ পিতামাতার দীর্ঘশ্বাস এসবই আমাদের সামাজিক বাস্তবতার এক কঠিন প্রতিচ্ছবি।

    এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম (বিএমএসএফ) গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে কারাবন্দী সাংবাদিকদের অবিলম্বে মুক্তি এবং পলাতক সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির মতে, সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে শাস্তি বা হয়রানির মুখোমুখি হতে হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো পরিবারের ওপর। আয়-উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে গেলে পরিবারগুলো মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে।

    সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়; এটি গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ। একজন সাংবাদিক যখন সত্য তুলে ধরেন, অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন করেন, তখন তিনি মূলত জনগণের পক্ষেই কথা বলেন। কিন্তু যদি সেই দায়িত্ব পালনের ফল হয় কারাবাস, মামলা-হামলা কিংবা আত্মগোপন, তবে তা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য অশনিসংকেত। অবাধ তথ্যপ্রবাহ ব্যাহত হলে গণতান্ত্রিক কাঠামোও দুর্বল হয়ে পড়ে।

    রমজান আমাদের শেখায় সংযমের পাশাপাশি ক্ষমা ও মানবিকতার অনুশীলন। এই সময়ে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি ইতিবাচক ও মানবিক সিদ্ধান্ত যেমন কারাবন্দী সাংবাদিকদের জামিন বা মুক্তির উদ্যোগ, কিংবা পেশাগত কারণে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর পুনর্বিবেচনা সমাজে আস্থার সঞ্চার করতে পারে। এতে শুধু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কষ্ট লাঘব হবে না, গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যেও নিরাপত্তা ও ন্যায্যতার অনুভূতি জোরদার হবে।

    একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিক পরিবারের জন্য বিশেষ সহায়তা তহবিল গঠন, আইনি সহায়তা প্রদান এবং সাংবাদিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাংবাদিকরা শত্রু নন; তারা রাষ্ট্র ও সমাজের অংশীদার। মতভেদ থাকতে পারে, সমালোচনা থাকতে পারে কিন্তু তা যেন কখনো দমন বা প্রতিহিংসার রূপ না নেয়।

    রমজানের পবিত্র মাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় ক্ষমা মহত্ত্বের পরিচায়ক, সহমর্মিতা শক্তির বহিঃপ্রকাশ। তাই এই সময়ে কারাবন্দী ও পলাতক সাংবাদিকদের পরিবারের কান্না থামাতে সংশ্লিষ্ট মহলের মানবিক ও দূরদর্শী পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। ন্যায়, সহমর্মিতা ও মানবিকতার ভিত্তিতেই গড়ে উঠুক একটি শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল গণতন্ত্র।

    আহমেদ আবু জাফর
    সভাপতি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি

    চেয়ারম্যান, ট্রাস্টি বোর্ড
    বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম
    ০১৭১২৩০৬৫০১
    ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬।