মো: আল মাসুম খান,বার্তা সম্পাদক।
বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) খাতে ঋণনির্ভর ব্যবসার বিস্তার যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে ঋণঝুঁকি ও খেলাপির সংখ্যা। শুরুতে স্বাভাবিক ভাবে চলা অনেক ব্যবসা ধীরে ধীরে বড় ঋণচাপে পড়ে যাচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা সম্পদ নিলামে ওঠার মতো পরিস্থিতিতে গড়াচ্ছে।
ব্যাংকিং খাত ও সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই ধরনের পতন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্নে অনেক ব্যবসা একই পথে এগোচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা সাধারণত Black Plate Sheet (BP Sheet) বা অনুরূপ শিল্পপণ্য দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। এই পণ্য বাস ট্রাক বডি, শিপ ফ্যাব্রিকেশন, কন্টেইনার ও রুফিং শিল্পে ব্যবহৃত হয়। একই সঙ্গে নির্মাণ খাতে পাথর, বিটুমিনসহ বিভিন্ন আমদানি পণ্যও ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ব্যবসার মূল অংশ হিসেবে থাকে।
প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যবসার চিত্র থাকে স্বাভাবিক। পণ্য বৈধ, গ্রাহক নিয়মিত, বাজারে চাহিদা থাকে এবং ব্যাংক লেনদেনও স্বাভাবিক থাকে।
তবে মূল সংকট দেখা দেয় working capital ঘাটতিতে।
সরবরাহকারীদের অগ্রিম পরিশোধ করতে হলেও অনেক ক্রেতার কাছ থেকে বাকি পাওয়ার কারণে নগদ প্রবাহে ঘাটতি তৈরি হয়।
এই ঘাটতি পূরণে ব্যাংক থেকে working capital লিমিট নেওয়া হয়। শুরুতে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকার সীমা থেকে তা ধীরে ধীরে কয়েক কোটি টাকায় পৌঁছে যায়।
উল্লেখ্য, ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, প্রাথমিক ভাবে এটি স্বাভাবিক ব্যবসা সম্প্রসারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
লিমিট বাড়ার পর কিছু ব্যবসায়ী ব্যাংক ফাইন্যান্স ব্যবহার করে কেবল নিজের ব্যবসা নয়, বরং তৃতীয় পক্ষের বাণিজ্যিক কার্যক্রমেও যুক্ত হন।
একাধিক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, LC খুলে আমদানি কার্যক্রম পরিচালনা করা হলেও প্রকৃত ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণ থাকে অন্য পক্ষের হাতে।
ব্যাংকিং সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে জানান, অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকরা কমিশন বা অতিরিক্ত আয়ের আশায় নিজের লিমিট ব্যবহার করে অন্যের ব্যবসা পরিচালনায় অংশ নেন। এতে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ গ্রাহকের হাত থেকে সরে যায়।
প্রথমদিকে লেনদেন স্বাভাবিক থাকলেও পরবর্তী সময়ে ঝুঁকি বাড়তে থাকে। ব্যবসার এক্সপোজার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায় ঋণের পরিমাণ বাড়ছে কিন্তু নগদ প্রবাহ সেই অনুপাতে বাড়ছে না। স্টক ও বিক্রির মধ্যে অমিল তৈরি হয় এবং পাওনা আদায় অনিয়মিত হয়ে পড়ে।
একই সময়ে অনেক ব্যবসায়ীর জীবন যাত্রায় পরিবর্তন দেখা যায়। নতুন গাড়ি, বাড়ি নির্মাণ এবং অতিরিক্ত ব্যয় ব্যবসার নগদ প্রবাহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে না।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত। ব্যবসার আয় না বাড়লেও ব্যক্তি গত ব্যয় বাড়লে ঋণনির্ভরতা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
ব্যাংক যখন নগদ প্রবাহ, স্টক এবং লেনদেনে অসঙ্গতি শনাক্ত করে তখন সীমিতকরণ বা সতর্কতা জারি করে। তবে অনেক ব্যবসায়ী এটিকে সহযোগিতা হিসেবে না দেখে বাধা হিসেবে বিবেচনা করেন।
এরপর অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক পরিবর্তনের প্রবণতা দেখা যায়। এক ব্যাংক ঝুঁকি সংকেত দিলে ব্যবসায়ী অন্য ব্যাংকে যান, যেখানে তুলনা মূলক ভাবে বেশি লিমিট অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে মোট ঋণ এক্সপোজার আরও বেড়ে যায়।
এক পর্যায়ে ব্যবসা বড় আকার ধারণ করলেও ভেতরে ভেতরে সংকট ঘনীভূত হতে থাকে। পাওনা আটকে যায়, চেক ডিজঅনার হয়, LC দায় পরিশোধে ব্যর্থতা তৈরি হয় এবং ব্যাংক ঋণ অনিয়মিত হয়ে পড়ে।
ব্যাংক তখন আইনগত পদক্ষেপ নেয় এবং মর্টগেজ সম্পত্তি নিলামে তোলে। অনেক ক্ষেত্রে পুরো দায় সমন্বয় সম্ভব হয় না।
ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, SME খাতে খেলাপি হওয়ার পেছনে কিছু সাধারণ কারণ রয়েছে।
প্রথমত, ঋণকে ব্যবসার বিকল্প হিসেবে দেখা হয়। দ্বিতীয়ত, নগদ প্রবাহ বিশ্লেষণে দুর্বলতা থাকে। তৃতীয়ত, তৃতীয় পক্ষের প্রভাব ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করে। চতুর্থত, সহজ লাভের প্রত্যাশা কাজ করে। পঞ্চমত, ব্যক্তিগত ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ষষ্ঠত, পাওনা ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা দেখা দেয়।
একজন সিনিয়র ব্যাংকার বলেন, অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা ঋণ দেওয়া নয়, বরং সেই ঋণের ব্যবহার এবং নিয়ন্ত্রণের অভাব।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের SME খাতে অনেক ব্যবসার পতন হঠাৎ ঘটে না। এটি একটি ধীর প্রক্রিয়া, যেখানে শুরুতে থাকে প্রবৃদ্ধি, এরপর অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ, পরে নিয়ন্ত্রণ হারানো এবং শেষ পর্যন্ত নগদ প্রবাহ ভেঙে পড়া।
অর্থনীতিবিদদের মতে, টেকসই ব্যবসার মূল ভিত্তি হলো ঋণ নয়, বরং নগদ প্রবাহ এবং আর্থিক শৃঙ্খলা।
মতামত ও নীতিগত দাবি
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য LC সুবিধা নিয়ে বর্তমান ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করছেন অনেক উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী মহল। তাঁদের মতে, বিদ্যমান কাঠামোয় তুলনা মূলক ভাবে বড় ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরা বেশি সুবিধা পেলেও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা অনেক ক্ষেত্রে একই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বিশেষ করে নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে ব্যবহৃত পাথর, বিটুমিন সহ গুরুত্বপূর্ণ আমদানি পণ্যের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ ও ন্যায্য LC সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। অনেক ব্যবসায়ী মনে করেন, ভোমরা ও বেনাপোল সহ সীমান্ত বন্দর দিয়ে ভারত থেকে পাথর আমদানির ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র আমদানিকারকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে LC সুবিধা দেওয়া হলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং নতুন উদ্যোক্তারা টিকে থাকার সুযোগ পাবেন।
ব্যবসায়ীদের দাবি, বর্তমানে LC সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য থাকায় নতুন ও ছোট ব্যবসায়ীরা বাজারে প্রবেশ করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়ছেন। এতে করে একটি সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যেই আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থা কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে।
অনেকেই মনে করেন, ব্যাংকিং নীতিমালায় এমন পরিবর্তন আনা প্রয়োজন যাতে সকল উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীর জন্য সমানভাবে LC সুবিধা নিশ্চিত করা যায়। একই সঙ্গে ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতে স্বচ্ছ ও সহজ প্রক্রিয়ায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরও সময়োপযোগী সুবিধা দেওয়া গেলে দেশে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে এবং কর্মসংস্থান বাড়বে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নীতিগত ভাবে ব্যাংকিং খাতে অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবর্তন আনা গেলে একদিকে যেমন আমদানি নির্ভর খাতে প্রতিযোগিতা বাড়বে, অন্যদিকে ছোট ব্যবসায়ীরাও বড় বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবেন।