রংপুর প্রতিনিধি।
রংপুরে বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম-বিএমএসএফের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক মশিউর রহমান ওরফে উৎস রহমান হত্যা মামলায় ১১ বছর পর পলাতক একজনকে মৃত্যুদণ্ড ও দুজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রংপুর মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মশিউর রহমান খান এ রায় ঘোষণা করেন। তবে এ রায়ে খুশি হতে পারেননি সাংবাদিক মশিউর রহমান উৎসের মা নুর জাহান বেগম। তিনি মামলার সকল আসামীদের মৃত্যুদন্ড কামনা করে উচ্চ আদালতে যাবেন বলে জানিয়েছেন।
এদিকে বৃহস্পতিবার দুপুরে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ রায়ের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি আহমেদ আবু জাফর। তিনি বলেন, বহুল আলোচিত রংপুরের সাংবাদিক মশিউর রহমান উৎস হত্যাকান্ডে চার্জশীটভুক্ত সকল আসামীর মৃত্যুদন্ড হওয়া উচিত ছিল। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে তৎকালীন সময়ে ঢাকা, রংপুর সহ সারাদেশে সংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রতিবাদ সমাবেশ করে দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছিলেন। কিন্তু এ রায়ে মুল আসামী জহিরন আক্তার জুঁইকে খালাস দেওয়ায় আমরা খুশি হতে পারিনি। মাদককারবারি জুঁইয়ের পরিকল্পনা ও অর্থায়নে ভাড়াটে খুনিদের দ্বারা সাংবাদিক মশিউর রহমান উৎসকে হত্যা করা হয়। উচ্চ আদালতে মামলাটি পরিচালিত হলে আমরা সংগঠনের পক্ষ থেকে আইনগত সহায়তা দিতে প্রস্তুত আছি।
এ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হলেন রুবেল হেমরম। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পেয়েছেন এলিন ও শুভ কুমার। দণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামিই পলাতক রয়েছেন। একই মামলায় মূল অভিযুক্ত জহিরন আক্তার জুঁই ওরফে গেদিসহ অন্য আসামিদের খালাস দেওয়া হয়েছে। রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আব্দুল হাদী বেলাল।
মামলা সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় রংপুরের স্থানীয় দৈনিক যুগের আলো কার্যালয়ে যান পত্রিকাটির স্টাফ রিপোর্টার মশিউর রহমান ওরফে উৎস রহমান। ওই রাতে তিনি আর বাড়ি ফেরেননি। পরদিন সকালে নগরীর ধর্মদাস এলাকায় একটি গাছের সঙ্গে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় নিহতের মা নুরজাহান বেগম নুরী রংপুর কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ আটজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়। পরে আদালত ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন।
দীর্ঘ প্রায় ১১ বছর ধরে চলা বিচারপ্রক্রিয়ায় ১১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ এবং উভয়পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক শেষে বুধবার রায় ঘোষণা করেন আদালত।
রায় ঘোষণার পর আদালতের বারান্দায় কান্নায় ভেঙে পড়েন মামলার বাদী ও নিহত সাংবাদিক উৎস রহমানের মা নুরজাহান বেগম। তিনি বলেন, ‘ন্যায় বিচার পাইলাম না। আমি এতদিন আদালতে ঘুরি, কিন্তু ন্যায়বিচার হইল না।’
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আব্দুল হাদী বেলাল ও বাদীপক্ষের আইনজীবী পলাশ কান্তি নাগ বলেন, ‘মামলার অভিযোগ অনুযায়ী জহিরন আক্তার জুঁই ওরফে গেদি ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা দিয়ে সাংবাদিক উৎস রহমানকে হত্যার পরিকল্পনা ও অর্থায়ন করেছিলেন। অথচ আদালত মামলার মূল অভিযুক্তকে খালাস দিয়েছেন।’
তারা বলেন, ‘এই রায়ে আমরা আইনজীবীসহ নিহতের পরিবার সংক্ষুব্ধ। এ মামলার বিষয়ে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে। হত্যাকাণ্ডের মূলহোতা যদি পার পেয়ে যায়, তাহলে সমাজে অপরাধপ্রবণতা আরও বাড়বে।’
এদিকে একমাত্র পুত্র উৎসকে হারিয়ে এবং পুত্রের স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে বিপাকে মা নুর জাহান বেগম। তিনি চেয়েছিলেন পুত্র হত্যাকারীদের বিচার নিজ চোখে দেখে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবেন। কিন্তু এখন তা হবে কি-না সন্দেহ মা নুর জাহানের। তিনি প্রধান মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে মামলাটির সঠিক বিচার দাবি করেন।

Leave a Reply