৭ নভেম্বর ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান– ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম

News 52 bangla.

৭ নভেম্বর ২০২৬। ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। ১৯৭৫ সালের এই দিনে দেশের সিপাহি-জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সকল চক্রান্ত রুখে দিয়েছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ নভেম্বর তাই এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এটি শুধু একটি দিনের নাম নয়; এটি জাতির শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করার, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের একটি প্রতীক।

বাংলাদেশের জন্ম, মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী রাজনৈতিক উত্থান-পতন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি প্রবাদবাক্য প্রণিধানযোগ্য: “অতীত নিয়ে সবসময় পড়ে থাকলে এক চোখ অন্ধ, অতীতকে ভুলে গেলে দু’চোখই অন্ধ।” ইতিহাসকে অস্বীকার করা যায় না; আবার ইতিহাসের গণ্ডিতে আটকে থেকেও ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা যায় না। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের পথ রচনা করাই একটি জাতির পরিপক্বতার পরিচয়। ৭ নভেম্বর আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়—স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষায় জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের পথ নির্ণয়ের একটি তারিখ। যারা বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করে রাখতে চেয়েছিল, যারা জনগণের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার হরণ করে দেশে একদলীয় স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করতে চেয়েছিল, যারা দেশের শৌর্য, বীর্য, সাহস ও সম্মানের প্রতীক সেনাবাহিনীর গৌরবকে ভূলুণ্ঠিত করতে চেয়েছিল—১৯৭৫ সালের এই দিনে দেশপ্রেমিক সিপাহি-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমে তাদের পরাজয় ঘটে। এই বিপ্লব প্রমাণ করে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে বিকিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়; এটি লাখো শহীদের রক্ত ও কোটি মানুষের আকাঙ্ক্ষার ফসল।

১৯৭৫ সালের পটভূমি: চার দিনের অনিশ্চয়তা

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে চরম অস্থিরতা শুরু হয়। এরপর সেনা অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশ এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির দিকে এগোতে থাকে। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি উচ্চাভিলাষী অংশ সামরিক অভ্যুত্থান ঘটায়। তারা তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনে বন্দি করে। এরপর বঙ্গভবনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমদকে গ্রেফতার করা হয়, মন্ত্রিসভা বিলুপ্ত ও জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রধান বিচারপতি আবু সা’দাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতির পদে বসানো হয়।

এই ঘটনায় সাধারণ জনগণ ও সিপাহীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর সর্বমহলে, বিশেষত সাধারণ সিপাহীদের কাছে ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। ফলে তারা পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ ও জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার পরিকল্পনা করতে থাকে। ৩ থেকে ৬ নভেম্বর মধ্যরাত পর্যন্ত দেশ এক শ্বাসরুদ্ধকর, অনিশ্চিত ও ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে থাকে। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়ে। কিন্তু ৬ নভেম্বর গভীর রাতে সেনাবাহিনীর সাধারণ সিপাহীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সেই অভ্যুত্থানে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন নিয়ে আপামর জনতা রাজপথে নেমে আসে। সিপাহি-জনতার মিলিত সেই বিপ্লবে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। পাল্টা অভ্যুত্থান ঠেকাতে গিয়ে প্রাণ হারান খালেদ মোশাররফ ও তার কতিপয় অনুসারী।

পরদিন ৭ নভেম্বর সর্বস্তরের সৈনিক ও জনতা সম্মিলিতভাবে ঢাকার রাস্তায় নেমে আসে; এই ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। অভূতপূর্ব এক সংহতির নজির সৃষ্টি হয়। ৬ নভেম্বর মধ্যরাতে ঘটে সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ বিপ্লব, যা ইতিহাসে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে স্থান লাভ করে।

লেখক:- ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *