কাশ্মীরে শোরগোল
—– মোহাম্মদ হাসানুর রহমান
দ্বিতীয় পর্ব
বৃটিশরা ভারত উপমহাদেশ ছেড়ে যাওয়ার পূর্বে তাঁদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ছোট-বড় ৫৬৫ টি রাজ্যগুলোকে তাঁদের পছন্দ মাফিক পাকিস্তান অথবা ভারতের সাথে একত্রিত হতে নির্দেশনা দেন। বেশিরভাগ রাজ্যই বৃটিশদের নির্দেশনা মেনে নিয়ে রাজ্যগুলো সুবিধা অনুযায়ী কেউ ভারত আবার কেউ পাকিস্তানের সাথে সম্পৃক্ত হয়। তবে কয়েকটি রাজ্য যুক্ত হওয়ার বিষয়ে কোনো আগ্রহ দেখায়নি। যে রাজ্যগুলো দ্বিধান্বিত তাদের মধ্যে কাশ্মীর ছিল অন্যতম। কশ্মীর ভারত বা পাকিস্তান কারো সাথেই যুক্ত হয়নি ।
তৎসময়ে কাশ্মীরের জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অর্থাৎ তিন-চতুর্থাংশ মতান্তরে পঁচাশি ভাগই ছিল মুসলিম জনগোষ্ঠী । তবে সেখানে রাজ্যের শাসক ছিলেন একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী, যার নাম মহারাজা হরি সিং। এ সময় কাশ্মীরের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণ চাইছিলো পাকিস্থানের সাথে যোগ দিতে। অন্যদিকে মহারাজা হরি সিং’র পছন্দ ভারত। এমন পরিস্থিতিতে বৃটিশরা কাশ্মীরের রাজপুত্রদের স্বাধীন থাকার বিষয়ে তাঁদের পছন্দ মাফিক পাকিস্তান বা ভারত বা নির্দিষ্ট সংরক্ষণের সাথে স্বাধীন থাকার অধিকার ভোগ করবে মর্মে কাশ্মীর মহারাজা হরি সিংকে নির্দেশনা দিয়ে ভারতবর্ষ থেকে তাঁদের শাসন গুটিয়ে চলে যান।
মহারাজা হরি সিং রাজ্যের স্থিতি বজায় রাখতে ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশের সাথেই চুক্তি করতে মনস্থ করেন। কিন্তু তিনি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলেন। এছাড়া উপজাতীয় মুসলিম বিপ্লব থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য তিনি তেমন কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সামর্থ্য হন নি। এ কারনেই হরি সিং ১৯৪৭ সালে অক্টোবরে ভারতীয় ইউনিয়নে অন্তর্ভূক্তির জন্য এক উপকরণে স্বাক্ষর করেন। যদিও সেটা কোনো চুক্তি ছিল না, অতপরও কাশ্মীরের সাধারণ জনগণের কথা চিন্তা না করে তিনি কেবলমাত্র নিজেকে রক্ষার জন্য ভারতের কাছে সামরিক সহযোগিতা চান । সাধারণ জনগনের পক্ষে পাকিস্তান মমদপুষ্ট উপজাতি গোষ্ঠির আক্রমন প্রতিহত করতে হরিসিং এর আমন্ত্রণে কাশ্মীরে ভারতীয় বাহিনী দমন অভিযান পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান পাকাপোক্ত করে। ইতোমধ্যে মহারাজা হরি সিং পালিয়ে জম্মু শহরে চলে যান।
ভারতীয় বাহিনীর অভিযানে কাশ্মীরে শান্তি ফিরে আসেনি বরং এ অভিযানের ধারাবাহিকতায় ১৯৪৮ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রথম যুদ্ধ শুরু হয়। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ১৯৪৯ সালের জানুয়ারি মাসে যুদ্ধ বিরতি কার্যকর হয় এবং যুদ্ধ বিরতি লাইনকে নিয়ন্ত্রন রেখা হিসাবে মেনে নিয়ে এ অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ভারত ও পাকিস্তান উভয়পক্ষ অঙ্গীকার করে।
রাজা হরি সিংস এর অদূরদর্শিতা এবং ইচ্ছের মূল্য চোকাতে গিয়ে অখণ্ড কাশ্মীর বিভক্ত হয়ে পড়ে, একদিকে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীর ও গিলগিট-বালতিস্তান অন্যদিকে ভারত-নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীর। কাশ্মীরের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের আশা আকাঙ্খা অন্ধকারের অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়। স্বাধীনতার বদলে কাশ্মীর নিয়ে ভারত, পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক রশি টানাটানি চলমান এবং এটা বিশ্বের অন্যতম বিপদজনক এক সামরিক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে । স্বাধীন জীবন ব্যবস্থার বিপরীতে কাশ্মীরের নিরীহ জনগণ আজ পরাধীনতার শিকলে বন্দী। একজন অবিবেচক হীন স্বার্থান্বেষী রাজার ইচ্ছে জনদূর্ভোগ কতটা নির্মম হতে পারে সেটা কাশ্মীরে পরিস্থিতি দেখে উপলদ্ধি করা যায়।
ভূ-স্বর্গ কাশ্মীরের ইতিহাস কখনই মসৃণ ছিল না। ১৯৬২ সালে লাখাদ নিয়ে ভারত- চীন এবং ১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালে ভারত-পাকিস্তান পরস্পরের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ১৯৬৬ সালে তাসখন্দ (উজবেকস্তান) এবং ১৯৭২ সালে সিমলা চুক্তি অনুসারে পারস্পারিক সু-সম্পর্ক বজায় রেখে সহাবস্থান নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেন। তবে ১৯৯৯ সালে কারগিল যুদ্ধের কারণে পরিস্থিতি আবারো খারাপ আকার ধারণ করে। অবশেষে ২০০৪ সালে উভয়ের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলে পরিস্থিতির উন্নতি হয়। কিন্তু কাশ্মীরে শান্তি আসেনি, ২০০৮ সালে অমরনাথ গুহার মাজারে তীর্থযাত্রীদের আগমন নিয়ে আবারো সহিংসতা শুরু হয়। তীর্থযাত্রীদের জন্য সরকার বনভূমি হস্তান্তরের অনুমোদন দেয়। সরকারের এ সিদ্ধান্তে কাশ্মীর উপত্যকায় ব্যাপক বিক্ষোভের জন্ম দেয়। বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতারা এবং স্থানীয়রা মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে জনসংখ্যা পরিবর্তনের আশঙ্কা প্রকাশ করে সরকারী সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে। পরবর্তীতে সরকার বিক্ষোভের গুরুত্ব আমলে নিয়ে বনভূমি হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।
ভারতের হিন্দুবাদী বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারত শাসিত অঞ্চলের স্বায়ত শাসন এবং ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করে সেখানে কার্ফু জারি করে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায় ও ভিন্নমতের উপর অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়। কাশ্মীরে মুসলিম সংগোরিষ্ঠতার স্থলে হিন্দু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ানোই হলো হিন্দুত্ববাদ সরকারের মূল লক্ষ্য বলে অনেকেই আশঙ্কা করেন। অন্যদিকে কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের ধারণা মুসলমান জনগোষ্ঠীকে নির্যাতনের মাধ্যমে দমিয়ে রেখে উগ্রবাদী হিন্দু জনগোষ্ঠীর সুবিধা দিতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এখানে নিপিড়নমূলক তৎপরতা চালাচ্ছে।
কাশ্মীর ভারত-পাকিস্তান-চীন এ ত্রিদেশীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ধর্মীয় বিভাজন এবং প্রতিকূল পরিবেশ এখানকার নিত্য সঙ্গী। এখানকার মানুষের আচার আচরণ এবং সংস্কৃতিবোধ অনেকটাই আলাদা। সাধারণ মানুষের পক্ষে কশ্মীরের রীতি-নীতি এবং সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হওয়া ও মানিয়ে চলা মোটেও সহজ নয়।
চলবে