কাশ্মীরে শোরগোল (৩য় পর্ব)—- মোহাম্মদ হাসানুর রহমান

কাশ্মীরে শোরগোল
—– মোহাম্মদ হাসানুর রহমান

তৃতীয় পর্ব
আগে জম্মু, কাশাীর উপত্যকা এবং লাদাখ তিনটি আলাদা আলাদা প্রশাসনিক অঞ্চল ছিল। হরি সিং ভারতীয় ইউনিয়নে অন্তর্ভূক্তির উপকরণে স্বাক্ষর করার পর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী এ অঞ্চল নিয়ে ভারত, পাকিস্তানের প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে ভারত, পাকিস্তান, চীন সকলেই এ অঞ্চলে তাদের সামরিক উপস্থিতি শক্তিশালী করে এবং এ অঞ্চলে এখন সার্বক্ষণিক যুদ্ধাবস্থা বজায় রয়েছে।
১৯৪৯ সালের যুদ্ধ বিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে “জম্মু”, “কাশ্মীর উপত্যকা” এবং “লাদাখ” ভারতের নিয়ন্ত্রনে থাকে অন্যদিকে “আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর” এবং “গিলগিট-বালতিস্তান” পাকিস্তানের আওতাধীন। নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে নিয়ন্ত্রণ রেখা আজও বজায় আছে। তবে উভয় দেশ মাঝেমধ্যে অখণ্ড কাশ্মীর নিজেদের কব্জায় নেওয়ার উচ্চাকাঙ্খা পোষণ করে। ভূ-রাজনৈতিক কারনে ভারত-পাকিস্তান এ দু’দেশই কাশ্মীরের জনগণের দুঃখ-দুর্দশাকে উপেক্ষা করে এখানে নিজেদের সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মহড়াস্থল বানিয়ে রেখেছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে কাশ্মীরের জনগণের আশা-আকাঙ্খা তাঁদের নিজেদের ইচ্ছের উপর নির্ভর করে না। কাশ্মীরে রাজনৈতিক সমাধানের চেয়ে ভারত ও পাকিস্তান সামরিক উপায়ে কাশ্মীর সমস্যার সমাধানকে বেশি প্রাধান্য দেয়। যে কারনে কাশ্মীরের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ভারত ও পাকিস্তান দু’দেশের কাছেই বরবারই উপেক্ষিত। প্রত্যেকেই ধর্মীয় বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে কাশ্মীরে যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান।
সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিম জনগোষ্ঠির আকাঙ্খা ছিল পাকিস্তানের সাথে সম্পৃক্ত হওয়া। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর জনগণের ইচ্ছের প্রতিফল ঘটে এবং এ এলাকা নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা হয় না। কিস্তু ভারত নিয়ন্ত্রিত অংশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণের মতামত অগ্রাহ্য করে ভারতের সাথে জবরদোস্তি অন্তর্ভূক্তির ফলে কাশ্মীর নিয়ে নানামুখী বিতর্ক চলমান আছে এবং সেটা হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল।
স্থানীয় কাশ্মীর মুসলিম নেতাদের দাবী অনুযায়ী হরি সিং রজ্যের মানুষের কথা সে একটি বারের জন্যও ভাবেননি। মহারাজা হরি সিং এর উচিত ছিল রাজা হিসাবে রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামতের মূল্যায়ন করা তাঁদের পাশে দাঁড়ানো। কিন্তু কাশ্মীরের জনগণের বিরুদ্ধে তিনি যুদ্ধ ঘোষণা করে সেনাবাহিনী দিয়ে দমন-পীড়ন শুরু করেন। ফলে রাজ্যের মানুষের হরি সিং এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা ছাড়া আর তাঁদের সামনে আর কোনো উপায় ছিল না। রাজার ভূমিকা পালনা না করে তিনি একজন কট্টর হিন্দুত্ববাদী ব্যক্তি হিসাবে নিজেকে ভারতের কাছে সোপার্দ করেছেন এবং ভারতের সাথে বিতর্কিত অন্তর্ভূক্তির উপকরণে স্বাক্ষর করেন। ফলস্বরূপ ভারত সেনা অভিযান পরিচালনা করে জোরজবরদস্তি কাশ্মীরে নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে । হরি সিং প্রকৃত অর্থে কাশ্মীরের জনগণের সাথে প্রতারণা করেছেন।
যদিও হরি সিং এর পুত্র ডঃ করণ সিং মনে করেন পাকিস্তানের মদদে কাশ্মীরের জনগন বিদ্রোহ করে, যে কারনে তাঁর পিতা ভারতের সাথে অন্তর্ভূক্তির উপকরণে স্বাক্ষর করে এবং কাশ্মীর ভারতের সাথে সম্পৃক্ত হতে বাধ্য হয়েছিল।
অন্যদিকে পাকিস্তানের দাবী হরি সিং যখন সংযুক্তি চুক্তি করেছে তখন তাঁর চুক্তি করার কোন অধিকারই ছিল না। সে কারনে পাকিস্তান স্থানীয় কাশ্মীরীদের রক্ষার্থে সমর্থন ও সহায়তা দিতে বাধ্য হয়েছে। পাকিস্তান ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন বন্ধ করার জন্য কাশ্মীরের জনগণকে সহায়তা করেছে। সুতরাং এ নিয়ে পাকিস্তানকে মোটেও সমালোচনা করা যায় না।
১৯৪৭ সাল থেকে ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের কাছে জম্মু ও কাশ্মীর গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। জম্মু ও কাশ্মীর বিতর্কের অবসান ঘাটানোর উদ্যোগ হিসাবে জাতিসংঘ গণভোটের মাধ্যমে জম্মু ও কাশ্মীরে ভাগ্য নির্ধারণের প্রস্তাব দেয়। তবে জাতিসংঘ পূর্বশর্ত হিসাবে প্রথমে পাকিস্তানকে জম্মু ও কাশ্মীর হতে সম্পূর্ণ সৈন্য প্রত্যাহার এবং ভারতকে আংশিক সৈন্য প্রত্যাহার করতে বলে। ভারতের অনড় দাবী পাকিস্তানকে আগে সম্পূর্ণ সৈন্য প্রত্যাহার করতে হবে তারপর ভারত তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করবে। পাকিস্তানের প্রশ্ন তোলে ভারত কাশ্মীর থেকে তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করবে এর নিশ্চয়তা কোথায়। পাকিস্তানের কাছে ভারতের অবস্থান বিশ্বাসযোগ্য না হওয়ায় পাকিস্তান তাদের সম্পূর্ণ সৈন্য প্রত্যাহরে রাজি হয়নি।
অন্যদিকে জাতিসংঘের তৎকালীন নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি জেনারেল ম্যাকনটেন কাশ্মীর সমস্যার স্থানী সমাধানের জন্য ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশকে একই সাথে সকল সৈন্য প্রত্যাহার করার প্রস্তাবনা দেন। কিন্তু ভারত সরাসরি ম্যাকনটন প্রস্তাবকে প্রত্যাখান করে । এরপর স্যার ওয়েন ডিক্সন এর প্রস্তাবও ভারত মেনে নিতে অস্বীকার করে।
ডিক্সন মিশনের ব্যর্থতার পর মার্কিন রাষ্ট্রদূত লয় হেন্ডারসনের নিজে কাশ্মীর উপত্যকা ভ্রমণ করেন। সে সময় তিনি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন কাশ্মীরের জনগণকে ভারত বা পাকিস্তানের মধ্যে একটিকে দেশকে বেছে নেওয়ার সুযোগ দিলে কাশ্মীর উপত্যকার বেশিরভাগ মানুষই পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হবার আকাঙ্খা প্রকাশ করেন। তবে তাঁদের তৃতীয় একটা পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ দিলে সেটা অবশ্যই কাশ্মীরের জনগণের উত্তর “স্বাধীনতা”।
অন্যদিকে লাদাখ সংলগ্ন আকসাই চিন বৃহত্তর কাশ্মীরের একটি অংশ যা ১৯৬২ সালে চীন ও ভারতের মধ্যে যুদ্ধের ফলে চীন দখল করে নেয় এবং ১৯৬৩ সাল হতে চীন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। তারপর থেকেই আসকাই চিন সংলগ্ন লাদাখ নিয়ে চীন ও ভারতের মধ্যে একটা অস্বস্তিকর অবস্থা বিরাজ করছে। লাদাখ সীমান্তে ভারত এবং চীনের সামরিক উপস্থিতি অনেক বেড়েছে এবং এ অঞ্চলেও উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে।
—-চলবে

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *