কাশ্মীরে শোরগোল ( ৪র্থ পর্ব)
—– মোহাম্মদ হাসানুর রহমান
ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যদ্বয় ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদে বর্ণিত ধারা অনুযায়ী অন্যান্য রাজ্যগুলোর তুলনায় অনেক বেশি স্বায়ত্তশাসন ভোগ করতো। কাশ্মীরের নিজস্ব পতাকা, সংবিধান, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র এবং অনেক বিষয়ে নিজস্ব আইন প্রণয়নের ক্ষমতাও ছিল। কিন্তু ২০১৯ সালে ভারত সরকার ৩৭০ অনুচ্ছেদ বতিল করে জম্মু ও কাশ্মীরকে পুনর্গঠন করে কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলে পরিণত করে। এছাড়া সরকারীভাবে এখানে স্থায়ী বাসিন্দা সনদ দেওয়া শুরু হয় যা “ডোমিসাইল” নামে পরিচিত ।
কাশ্মীরের জনগণের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের কথা চিন্তা না করে ভারত সরকারের চাপিয়ে দেওয়া এমন কর্মকাণ্ডে স্থানীয় জনগণের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করে। সরকারের তরফ থেকে বলা হয় ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করার ফলে রাজ্যে শান্তি বিরাজ করছে। জম্মু ও কাশ্মীরে মানুষ স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবে এবং রাজ্যে শান্তি ফিরবে। এছাড়া ডোমিসাইল সুবিধার ফলে কাশ্মীরে প্রচুর পরিমাণে বিনিয়োগ আসবে এবং জীবনযাত্রার মানে গুণগত পরিবর্তন হবে।
কিন্তু সাধারণ মানুষের ধারণার সাথে সরকারের দাবী সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তাঁদের ধারণা কাশ্মীরের জনসংখ্যাগত কাঠামো বদলে দিতেই সরকার এ পরিকল্পনা করেছে। সাধারণ জনগোষ্ঠী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সুরক্ষার বদলে বড় বড় শিল্প গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে এবং হোটেল ও আবাসনখাতে তাঁদের অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বহিরাগতদের ডোমিসাইল সুবিধা দিয়ে স্থানীয়দের কোনঠাসা করে রাখার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা রয়েছে।
স্থানীয় মুসলিম জনসাধারণের ধারণা সরকারের তরফ থেকে আগ্রহী হিন্দুধর্মাবলম্বীদের আভ্যন্তরীণ অভিপ্রয়াণ প্রক্রিয়ায় জমির মালিকানাসহ বসতি স্থাপনের সুযোগ করে দিতে ডোমিসাইল প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে সরকার হিন্দু-মুসলিম সংখ্যানুপাতের ভারসাম্য আনার চেষ্টা করছে। কাশ্মীরে মুসলিম গরিষ্ঠতা হ্রাস করার জন্য আন্তঃআঞ্চলিক এ স্থানান্তর হিন্দুত্ববাদী ডোসিমাইল কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে সফল হলেও স্থানীয় জনগণের এতে তেমন কোনো উপকারে আসবে না।
কাশ্মীরে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করে রাজ্যটি কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণে আসলেও প্রকৃত অর্থে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত হয়নি। সামরিকীকরণ বৃদ্ধি হয়েছে এবং সমাজে সন্দেহ প্রবণতার বীজ থেকে ইতোমধ্যে চারা গজিয়েছে। সাধারণ মানুষের যাতায়াত নিয়ন্ত্রিত এবং চৌকিগুলোতে স্থানীয় মানুষের হয়রানি আগের থেকে অনেক বেশি বেড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের পরস্পরের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস এতটাই প্রকট হয়েছে যে, সাধারণ লোকজন একজন আরেকজনের সাথে নির্ভয়ে কথা বলতে পারে না। এক কথায় বলা চলে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করার ফলে কাশ্মীরে শান্তি ফেরেনি বরং জনসাধারণের দূর্ভোগ অনেকক্ষেত্রে বৃদ্ধি পেয়েছে।
পাহলগাম সন্ত্রাসী ঘটনার পর কাশ্মীর পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে। নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ। দু’দেশের সেনারা নিয়মিত গোলা বিতরণ করে নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দিচ্ছে। উভয় দেশ ফলাও করে নিজেদের সফলতার ফিরিস্তি প্রকাশ করে। অন্যদিকে অশান্ত কাশ্মীরের সাধারণ অধিবাসীরা পড়েছে চরম ভোগান্তির মধ্যে। তাঁদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব হয়েছে, রাজনৈতিক অধিকার হারিয়েছে। ভয়ে তটস্থ কাশ্মীরের স্থানীয় মানুষ গ্রেপ্তার আতঙ্কে সরকারের সমালোচনা করতেও শঙ্কাবোধ করে।
সাধারণ মানুষ সর্বদাই কাশ্মীরে স্থায়ী শান্তির প্রত্যাশা করে। কিন্ত সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার সাথে রাজনৈতিক মতাদর্শ ও রাষ্ট্রীয় চিন্তু-চেতনার বিস্তর ফারাক রয়েছে। সরকার এবং জনগণ সবার লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রেখে রাজ্যের উন্নয়ন। কিন্তু কাশ্মীরে শান্তির পথ মোটেও মসৃণ নয়, এখানে জনগণের মতামত ছাড়াও রাষ্ট্রীয় মেরুকরণের বিষয় জড়িত।
কাশ্মীরে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য কুটনৈতিক পন্থায় স্থায়ীভাবে সমাধান খুঁজে পাওয়া জরুরী। তবে সেটা কেবলমাত্র ভারত কিংবা পাকিস্তানের একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। স্থানীয় জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছার গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের মতামতকে আস্থায় আনা এবং কুটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে ভারত-পাকিস্তান উভয় দেশের উচিত বিশ্বাসযোগ্য পথ খুঁজে নিয়ে পারস্পরিক আস্থার জায়গা তৈরী করা দরকার। এছাড়া অমিমাংসীত সমস্যার সমাধানসহ সীমান্তে উত্তেজনা হ্রাস করতে করণীয় পথগুলো খুঁতে পেতে উভয়পক্ষ পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্য পথ অনুসরণ করতে পারে। তবে ভারত কাশ্মীর সমস্যাকে বরাবরই নিজেদের আভ্যন্তরীন ও নিজস্ব বিষয় বলে মনে করে এবং কাশ্মীর প্রশ্নে ভারত তৃতীয় পক্ষের নাক গলানো মোটেও পছন্দ করে না। অন্যদিকে পাকিস্তান কাশ্মীর সমস্যার দ্বি-পাক্ষীক বা আন্তর্জাতিকভাবে সমস্যার সমাধান আশা করে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ভারত ও পাকিস্তানের কাছে কাশ্মীরের শান্তি আগে, না-কি কৌশলগত ভূ-খন্ডের দখল বজায় রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেটার গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে।
কাশ্মীরের জনগণের মতামত প্রতিষ্ঠিত হলে বা তাঁরা স্বাধীনতা লাভ করলে ভারত বা পাকিস্তান করো তেমন লাভ হবে না বরং উভয় দেশ কাশ্মীরের উপর তাঁদের নিয়ন্ত্রণ হারাবে। কাশ্মীরের গুরুত্ব বিবেচনায় ভারত বা পাকিস্তান কেউ সেটা মেনে নেবে না। দীর্ঘ দিনের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে এটা অনুমান করা যায়- ভারত এবং পাকিস্তান উভয়ের কাছেই কাশ্মীর এক কৌশলগত ভূ-খন্ড। যেখানে আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখাটা উভয়ের কাছেই অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে বেল্ট এন্ড রোড ইনেশিয়েটিভ, সিপিইসি করিডোর সুরক্ষা করা ছাড়াও কাশ্মীর প্রশ্নে ভারত ও পাকিস্থানের মধ্যকার বৈরীতাকে কাজে লাগিয়ে চীন উপমহাদেশে নিজেদের প্রভাব বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দিয়েছে। অর্থনৈতিক, ভূ-কৌশলগত এবং নিজেদের আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধিসহ নানা কারনে এ অঞ্চল নিয়ে চীন অনেক বেশি তৎপর। সম্প্রতিকালে পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কাশ্মীর প্রশ্নে নিজেদের অন্তর্ভূক্তিমূলকভাবে সম্পৃক্ত করতে কৃটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে। যদিও ভারত কাশ্মীর প্রশ্নে বরবরই তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
বৃটিশরা চলে যাওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত কাশ্মীরের জনগণের অর্জন তেমন কিছুই হয়নি বরং এখানকার জনগণের ভাগ্যে দুঃখ-দুর্দশা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। তাঁরা স্বার্বভৌমত্ব হারিয়েছে, পতাকা খুইয়েছে, নিজস্ব আইন প্রণয়নের ক্ষমতাও গেছে। এসেছে ডোমিসাইল যা কাশ্মীরে জনসংখ্যাগত কাঠামো পরিবর্তনের পথ সুগম করে কাশ্মীর সমস্যা আরো জটিল করে তুলেছে। যদিও ভূ-রাজনৈতিক দখলদারিত্ব বজায় রাখার জন্য ধর্মীয় বিভাজনকে জিইয়ে রেখে কাশ্মীরকে যুদ্ধক্ষেত্র বানিয়ে অশান্ত রাখা মোটেও সমীচীন নয়।
কাশ্মীরের শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ভারত-পাকিস্তান উভয় দেশের উচিত স্থানীয় জনগণের চাওয়া-পাওয়ার গুরুত্ব অনুধাবন করা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কাশ্মীরে সামরিকীকরণের বদলে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পথ সুগম করা সবচেয়ে জরুরী। সকলের কাছে বিশ্বসযোগ্য প্রক্রিয়ায় স্থানীয় রাজনীতিকে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে এনে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথ প্রশস্ত করা রাষ্ট্রীয়ভাবে ভারত সরকারের দায়িত্ব। জনগণের অংশগ্রহনমূলক প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক ধারা প্রাণ ফিরে পেলে ভারত বিরোধীতা অনেকাংশে কমবে এবং ভূ-স্বর্গ খ্যাত কাশ্মীরে শান্তির পথ উম্মুক্ত হবে।
চিরসুন্দর কাশ্মীরের অপরূপ সৌন্দর্য বিশ্ববাসীর কাছে উপস্থাপন করার জন্য পর্যটকদের নির্বিঘ্নে চলাফেরা নিশ্চিত করা একান্ত আবশ্যক। পর্যটন খাতকে টিকিয়ে রাখার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় জনসাধারণ এবং রাজনীতিবীদদেরকে বাস্তবতা উপলদ্ধি করতে হবে। উপজাতীয়, জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক সংঘাত থেকে কিভাবে একটি শান্তি প্রিয় ভূখণ্ড গড়ে তোলা যায় সেটা নিয়ে সকল কাশ্মীরবাসীকে সহাবস্থান বজায় রেখে ঐক্যের পথে হাঁটা যৌক্তিক। পর্যটকদের জন্য নিরাপদ ভ্রমণ এখানে বড় চ্যালেঞ্জ, সেটা মোকাবেলা করা গেলে কাশ্মীর হয়ে উঠবে সত্যিকারের এক আদর্শ ভূ-স্বর্গ।
সবুজ পাহাড়ে ঘেরা স্বচ্ছ লেক, পারিযায়ী পাখির কলরব, বরফে ঢাকা হ্রদ, গাছের দৃশ্য এবং উঁচু-নিচু পাহাড় এ এক অন্যরকম সৌন্দর্য। এ যেন বিধাতার এক অপরূপ দান। কাশ্মীরে সারা বছরই কোনো না কোনো ফল-ফুল মেলে। বাদাম, আখরোট, চেরি, নাশপাতি, এপ্রিকোট, পীচ, বরই, খুবানিসহ নানা জাতের সুস্বাদু ফলের সম্ভার কাশ্মীর। ঋতুভেদে দেখা মেলে টিউলিপ, ড্যাফোডিল, ডেইজি, লিলি, সূর্যমুখী, মাদাগাস্কার পেরিউইঙ্কল, পয়েইনসেটিয়া, সান স্পার্জ, বাদাম ফুলসহ নানা জাতের ফুল। বছরজুড়ে বৈচিত্রময় ফল-ফুলের ঘ্রাণে মৌ মৌ করে প্রাকৃতিক সৌন্দার্যের নৈসর্গিক এ লীলাভূমি। এখানে রয়েছে পাহাড়, ঝর্ণা, বয়ে চলা হিম শীতল ঠাণ্ডা জলের নদী, লেক, সবুজে ঘেরা উদ্যান। প্রকৃতি এখানে তাঁর সৌন্দর্যের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছে। ভ্রমণপিপাসুদের কাছে কাশ্মীর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা এক অন্যরকম শিহরণ জাগায়। মনোমুগ্ধকর এসব দৃষ্টিনন্দন দৃশ্যাবলী পর্যাটকের মনে প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়। কাশ্মীরের নয়নাভিরাম দৃশ্যাবলী ভ্রমণপিপাসুদের স্মৃতির পাতায় থাকে চির অম্লান।