
বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকের মৌলিক অধিকার, আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দেয়। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান পুলিশ, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা এসব অধিকার রক্ষার জন্যই প্রতিষ্ঠিত।
কিন্তু বাস্তবতার মাটিতে মাঝে মাঝে এমন কিছু ঘটনা সামনে আসে, যা এই মৌলিক আদর্শকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং সাধারণ মানুষের মনে গভীর হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার একটি সাম্প্রতিক ঘটনা তেমনই এক বিতর্ক ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে, যা শুধু একটি পরিবারের দুর্ভোগ নয়; বরং রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী ও প্রশাসনিক কাঠামোর মানবিকতা, জবাবদিহিতা এবং ন্যায়বিচারের চর্চা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে।
ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছেন জুবাইদা জন্নাত নামের এক তরুণী। তার জীবনকাহিনি বাংলাদেশের বহু অসহায় নারীর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। জন্মের কয়েক মাস পরই তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, যৌতুকের দাবিতে তার মাকে মারধর ও নির্যাতন করতেন তার বাবা। এই নির্যাতনের কারণেই ১৯৯৯ সালে জুবাইদার মা রেহেনা জন্নাত রানু আদালতের দ্বারস্থ হন। পরে মামলার আপোষ হলেও মা-মেয়ের জীবন আর স্বাভাবিক পথে ফিরে যায়নি। জুবাইদা বড় হয়েছেন মায়ের কাছেই, চকরিয়ায়। আর্থিক কষ্ট, সামাজিক চাপ এবং পারিবারিক সংকটের মধ্য দিয়েই তার বেড়ে ওঠা।
জুবাইদার মা কঠোর পরিশ্রম করে তাকে লেখাপড়া করিয়েছেন। বর্তমানে তিনি একটি কলেজে অনার্সে অধ্যয়ন করছেন। কিন্তু জীবনের এই পর্যায়ে এসে তাকে এমন একটি লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হয়েছে, যা তার অস্তিত্ব ও পরিচয়ের প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত।
জুবাইদার পিতা মৃত্যুবরণ করার পর সামনে আসে পৈতৃক সম্পত্তির বিষয়টি। ইসলামী উত্তরাধিকার আইন এবং বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী একজন সন্তান হিসেবে তিনি তার পিতার সম্পত্তিতে আইনগতভাবে অংশীদার। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
অভিযোগ রয়েছে, তার চাচা, জেঠা এবং চাচাতো ভাইরা তাকে সেই অধিকার দিতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে তিনি ন্যায়বিচারের আশায় আদালতের শরণাপন্ন হন। আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে পাঠায়। প্রথমে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পেকুয়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ডকে। পরে তিনি বিষয়টি তহসিলদারের কাছে তদন্তের জন্য দেন। কিন্তু দীর্ঘ সাত-আট মাস কেটে গেলেও কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত বা কার্যকর অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বরং এই দীর্ঘসূত্রতা ভুক্তভোগী পক্ষকে আরও অসহায় করে তোলে।
একই সময় জুবাইদা ওয়ারিশ সনদ পাওয়ার জন্য ইউনিয়ন পরিষদের দ্বারস্থ হন। কিন্তু সেখান থেকেও তিনি কোনো সহযোগিতা পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে। পিতৃপরিচয় ও ওয়ারিশ সনদের মতো একটি মৌলিক বিষয়ে একজন নাগরিক যদি প্রশাসনিক জটিলতার মধ্যে পড়ে দীর্ঘদিন ঘুরে বেড়ান, তাহলে তা রাষ্ট্রীয় সেবাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকেই সামনে আনে।
অবশেষে নিরুপায় হয়ে জুবাইদা আদালতে তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তনের আবেদন করেন। আদালত সেই আবেদন গ্রহণ করে এবং নতুন করে পেকুয়া থানাকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়। এই পর্যায়ে তদন্তের দায়িত্ব পান উপপরিদর্শক (এসআই) পল্লব।
এখানেই শুরু হয় ঘটনাটির সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়।
অভিযোগ অনুযায়ী তদন্ত প্রতিবেদন ভুক্তভোগী পক্ষের অনুকূলে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে এসআই পল্লব জুবাইদা ও তার মায়ের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। বলা হয়, টাকা না দিলে প্রতিবেদন বিপক্ষে যাবে। দরিদ্র মা-মেয়ে বহু কষ্টে সেই টাকা জোগাড় করে দেন। কিন্তু পরে যখন তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়, তখন দেখা যায় তা আসামিদের পক্ষে গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়নি এবং কোনো সাক্ষীও পাওয়া যায়নি। অথচ আদালতে জমা দেওয়া জন্মসনদসহ বিভিন্ন নথিতে জুবাইদার পিতার নাম ও পরিচয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে জুবাইদা ও তার মা নিজেদের প্রতারিত মনে করেন। তারা পেকুয়া থানার ওসি এবং সংশ্লিষ্ট সার্কেল কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে এসআই পল্লবের বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ তোলেন এবং তাদের দেওয়া টাকা ফেরত চান। এরপর যা ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে, তা আরও উদ্বেগজনক।
জানা যায়, গত ৫ মার্চ ২০২৬ তারা থানায় গিয়ে সেই টাকা ফেরত চাইলে উল্টো পুলিশি নির্যাতনের শিকার হন। পরে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) আদালতে হাজির করা হয় এবং এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
“যদিও আমি গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার বাইরে কোন ইস্যু নিয়ে লেখালেখি করিনা। তবে পেকুয়ার ঘটনাটি গতকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চরম বিতর্কিত পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। বিষয়টি নিয়ে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ জরুরী হয়ে গেছে। কেননা, একক কারো জন্য একটি রাষ্ট্রীয় বাহিনী এবং খোদ একটি জনপ্রশাসন প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে না”।
এখানেই মূল প্রশ্নগুলো সামনে আসে। প্রথম প্রশ্ন হলো যদি ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে এটি কেবল একটি ব্যক্তিগত অনৈতিকতার ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর মানুষের আস্থাকে গভীরভাবে আঘাত করে। পুলিশ জনগণের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত। সেখানে যদি ঘুষ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় গিয়ে বিচার চাইবে?
দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো মোবাইল কোর্টের ব্যবহার নিয়ে। মোবাইল কোর্ট সাধারণত তাৎক্ষণিক অপরাধ দমন বা প্রশাসনিক আইন প্রয়োগের জন্য ব্যবহৃত হয়। যেমন ভেজালবিরোধী অভিযান, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, পরিবেশ আইন লঙ্ঘন ইত্যাদি ক্ষেত্রে এটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কিন্তু কোনো বিরোধ বা অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরাসরি মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে কারাদণ্ড দেওয়া হলে তা কতটা ন্যায়সংগত এবং আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এই প্রশ্ন উঠতেই পারে।
তৃতীয় প্রশ্নটি আরও মানবিক। একজন এতিম কন্যা যদি তার পিতৃপরিচয় ও উত্তরাধিকার নিশ্চিত করার জন্য দীর্ঘদিন লড়াই করেন, প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ান, ঘুষের অভিযোগ তোলেন আর শেষ পর্যন্ত উল্টো কারাগারে যেতে হয়। তাহলে সেটি সমাজের জন্য কী বার্তা বহন করে?
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান এবং আইনের সমান সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী। একই সঙ্গে সংবিধান নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দেয়। কিন্তু বাস্তবে যদি একজন নাগরিক নিজের পরিচয় ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করতে গিয়ে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, তাহলে তা অবশ্যই গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
এ ধরনের ঘটনা আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও সামনে আনে, জবাবদিহিতা। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা থাকা জরুরি। কারণ ক্ষমতা যখন জবাবদিহিতার বাইরে চলে যায়, তখনই অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হয়। এখানে আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। সমাজে নারীরা, বিশেষ করে একক মায়ের সন্তানরা, প্রায়ই উত্তরাধিকার ও সামাজিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে নানা বাধার মুখে পড়েন। আইনের চোখে তারা সমান অধিকারী হলেও সামাজিক বাস্তবতায় তাদের সেই অধিকার আদায় করতে গিয়ে নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়।
পেকুয়ার এই ঘটনাটি তাই কেবল একটি পারিবারিক বিরোধ নয়; এটি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, আইনের শাসন এবং মানবিকতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো নিরপেক্ষ তদন্ত। অভিযোগগুলো সত্য না মিথ্যা তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব রাষ্ট্রেরই। যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় যে ভুক্তভোগী মা-মেয়ের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করা হয়েছে বা ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে মোবাইল কোর্টের ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আইনি ও নৈতিক দিকগুলো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ন্যায়বিচার শুধু আদালতের রায় নয়; এটি মানুষের বিশ্বাসের বিষয়ও। মানুষ যখন মনে করে রাষ্ট্র তার পাশে আছে, তখনই আইনের শাসন শক্তিশালী হয়। কিন্তু যখন তারা মনে করে তাদের অভিযোগ শোনার কেউ নেই, তখন সেই বিশ্বাস দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয় বারবার। সেই নীতির বাস্তব প্রতিফলন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
পেকুয়ার এই ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ন্যায়বিচার শুধু শক্তিশালীদের জন্য নয়; এটি দুর্বল ও অসহায় মানুষের জন্যও সমানভাবে নিশ্চিত হতে হবে। একজন নাগরিক তার পিতৃপরিচয় ও উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করলে তাকে দোষী নয়, বরং সহানুভূতির চোখে দেখা উচিত।
আজ প্রয়োজন সত্য উদঘাটন, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা। কারণ আইনের শাসনের মূল দর্শন একটাই কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয় এবং কোনো নাগরিকই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন না।
লেখক: আহমেদ আবু জাফর, চেয়ারম্যান, ট্রাস্টি বোর্ড, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম, ০১৭১২৩০৬৫০১, ৬ মার্চ ২০২৬ খ্রী: