মো: আল মাসুম খান,বার্তা সম্পাদক।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (খুমেক) বুধবার (২০ মে ২০২৬) ভোরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নাসরিন নাহার নামে এক আইসিইউ রোগীর মৃত্যু হয়েছে। আগুনের আতঙ্কে দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার সময় অক্সিজেনের ঘাটতিতে তার মৃত্যু হয় বলে জানা গেছে। নিহত রোগী খুলনার কয়রা উপজেলার নেছার আলির কন্যা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, জন্মগত ডায়াবেটিস জনিত জটিলতায় গত রবিবার তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। বুধবার ভোরে অগ্নিকাণ্ডের সময় তাড়াহুড়া করে নামানোর সময় মাস্ক খুলে গেলে অক্সিজেন সংকটে তার মৃত্যু হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আইসিইউ বিভাগের প্রধান ডা. দিলীপ কুমার কুন্ডু গণমাধ্যমকে জানান, আইসিইউতে মোট ১৫ জন রোগী ছিল। আমরা সবাইকে নিরাপদে সরাতে সক্ষম হই। তবে ওই রোগীর স্বজনরা তাকে নিজে থেকেই দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। নামানোর পথেই তার মৃত্যু হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ভোর আনুমানিক ৫টা ৫০ মিনিট থেকে ৬টার মধ্যে হাসপাতালের তৃতীয় তলায় ইমারজেন্সি অপারেশন থিয়েটার, পোস্ট অপারেটিভ কক্ষ ও স্টোর রুম এলাকায় আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে ধোঁয়ায় পুরো এলাকা আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে এবং রোগী, স্বজন ও চিকিৎসকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ধোঁয়ার কারণে ওটি ও পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডের ভেতরে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না বলে জানান কর্মীরা। দ্রুত মুমূর্ষু রোগীদের পেছনের দরজা দিয়ে এবং আইসিইউর রোগীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়।
ওয়ার্ড বয় রেজাউল গণমাধ্যমকে জানান, স্টো ররুম থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে সবাই দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বাধ্য হন।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মোট পাঁচজন আহত হয়েছেন। তারা হলেন—
হাসপাতালের স্টাফ সাইদুর রহমান (৫০), সিনিয়র স্টাফ নার্স নওরিন, দিপালী ও শারমিন এবং ফায়ার সার্ভিস সদস্য তৌহিদ।
প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, ধোঁয়ার মধ্যে থাই গ্লাসের গ্রিল কেটে আটকে পড়া নার্সদের উদ্ধার করা হয়। ফায়ার ব্রিগেডের স্টিলের সিঁড়ি ব্যবহার করে তাদের নামানোর সময় তীব্র আতঙ্কে একজন নার্স ও একজন ফায়ার সার্ভিস সদস্য ভারসাম্য হারিয়ে তিনতলা থেকে নিচে কংক্রিটের ওপর পড়ে যান। এতে তারা গুরুতর আহত হন।
একই ঘটনায় আরও দুইজন নার্স ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তাদের খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে।
এছাড়া তিন তলার থাই গ্লাসের গ্রিল কেটে কর্তব্যরত নার্সদের ফায়ার সার্ভিসের স্টিলের সিঁড়ি ব্যবহার করে নিচে নামানোর সময় ফায়ার সার্ভিস সদস্য তৌহিদ নিচে পড়ে আহত হন।
ফায়ার সার্ভিসের ১০ থেকে ১১টি ইউনিট প্রায় এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে কাজ করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। সহকারী পরিচালক জানান, চারতলা ভবনের তৃতীয় তলার স্টোর রুমে আগুনের সূত্রপাত হয়। শুরুতে গেট গুলো তালা বদ্ধ থাকায় ভেতরে প্রবেশে কিছুটা সময় লাগে। পরবর্তীতে ফায়ার ব্রিগেডের সদস্যরা তালা কেটে ভিতরে প্রবেশ করে।
পরবর্তীতে বেলকনি ও বিভিন্ন পথ ব্যবহার করে ৪–৫ জনকে উদ্ধার করা হয়। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর আর কোনো নতুন হতাহতের তথ্য পাওয়া যায়নি।
রোগী ও স্বজনরা এই প্রতিবেদককে জানান, অগ্নিকাণ্ডের সময় অধিকাংশ মানুষ ঘুমিয়ে ছিলেন। স্টোর রুম থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং ওটির ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেকেই আতঙ্কে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সে যোগে দ্রুত হাসপাতাল ত্যাগ করে অন্য বেসরকারি হাসপাতালে রোগীদের নিয়ে যান।
তারা অভিযোগ করেন, ওটিতে ২৪ ঘণ্টা কার্যক্রম চললেও এমন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা রহস্যজনক। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. হোসেন আলী গণমাধ্যমকে জানান, প্রাথমিক ভাবে ধারণা করা হচ্ছে শর্ট সার্কিট অথবা এসি বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে প্রকৃত কারণ তদন্তের পর জানা যাবে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী আইনুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, অগ্নিকাণ্ডের কারণে অক্সিজেন সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় সাময়িক ভাবে সব অপারেশন বন্ধ রাখা হয়েছে। দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রী খুলনার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন বলে জানা গেছে। তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবেন এবং সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করবেন।
সর্বশেষ পরিস্থিতি,
অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে এলেও হাসপাতাল জুড়ে এখনো আতঙ্ক বিরাজ করছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজ চলছে। প্রশাসন জানিয়েছে, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা হবে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও খুলনা জেলা প্রশাসক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের খোঁজ খবর নেন এবং সার্বিক পরিস্থিতি ঘুরে দেখেন। এ সময় তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে রোগীদের চিকিৎসা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেন।